হার্ট অ্যাটাক কি সকালেই বেশি হয়

বর্তমানে হৃদ্‌রোগ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম কারণ। বাংলাদেশেও দিন দিন হার্ট অ্যাটাকের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দিনের অন্য সময়ের তুলনায় ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাক তুলনামূলক বেশি হয়। অনেকেই প্রশ্ন করেন, এটা কি সত্যিই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, নাকি শুধুই কাকতালীয়?

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দিনের অন্য সময়ের তুলনায় ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাক তুলনামূলক বেশি হয়ছবি: পেক্সেলস

বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের অন্য সময়ের তুলনায় ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাক তুলনামূলক বেশি হওয়ার পেছনে আছে শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক পরিবর্তন, জীবনযাপনের অভ্যাস এবং কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রভাব।

মানুষের শরীর একটি নির্দিষ্ট জৈবিক ছন্দ বা ‘বডি ক্লক’ অনুযায়ী কাজ করে। ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সকালে শরীরে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয় এবং রক্তচাপ বাড়তে শুরু করে। একই সময়ে রক্ত কিছুটা ঘন হয়ে থাকে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়।

যদি কারও হৃৎপিণ্ডের ধমণিতে আগে থেকেই চর্বি বা ব্লক জমে থাকে, তাহলে এই অতিরিক্ত চাপ রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে।

কারণ কী

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোর ৪টা থেকে সকাল ১০টার মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ, ঘুমের সময় শরীর বিশ্রামে থাকলেও জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শরীর দ্রুত সক্রিয় হতে শুরু করে।

এই পরিবর্তনের ধাক্কা দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ হৃদ্‌যন্ত্র সহজে সামাল দিতে পারে না। বিশেষ করে যাঁরা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা স্থূলতায় ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।

অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনও সকালের হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কারণ। ধূমপান, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মানসিক চাপ এবং রাত জাগার অভ্যাস হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

অনেকে সকালে ঘুম থেকে উঠেই হঠাৎ ভারী ব্যায়াম বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম শুরু করেন। বিশেষ করে শীতকালে এটি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় রক্তনালি সংকুচিত হয়, ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত বুকের মাঝখানে তীব্র চাপ বা ব্যথা অনুভূত হয়, যা বাঁ হাত, কাঁধ, ঘাড়, পিঠ বা চোয়ালে ছড়িয়ে যেতে পারে। অনেক সময় রোগী শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা বা বমিভাব অনুভব করেন।

তবে সবার ক্ষেত্রে লক্ষণ একরকম না–ও হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বদহজমের মতো অনুভূতি বা পিঠে ব্যথাও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। তাই এসব উপসর্গকে অবহেলা করা উচিত নয়

প্রতিরোধে কী করবেন

সকালের হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রথমত, নিয়মিত ব্যায়াম ও হাঁটার অভ্যাস হৃদ্‌যন্ত্রকে শক্তিশালী করে। তবে সকালে ঘুম থেকে উঠেই হঠাৎ ভারী ব্যায়াম না করে কিছুক্ষণ ধীরে ধীরে শরীরকে প্রস্তুত করা ভালো।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তেল, চর্বি ও ফাস্টফুড এড়িয়ে শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খেতে হবে।

ধূমপান ও মাদকাসক্তি হৃদ্‌রোগের অন্যতম বড় কারণ। ধূমপান রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই হৃৎস্বাস্থ্য ভালো রাখতে ধূমপান সম্পূর্ণ পরিহার করা জরুরি।

পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা আছে, তাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। অনেক সময় রোগীরা শরীর ভালো লাগলে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন, যা হঠাৎ বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

কেউ যদি সকালে তীব্র বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ঘেমে যান, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রথম এক ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে সঠিক চিকিৎসা পেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শরীরের ছোট ছোট সংকেতকে গুরুত্ব দিলে এবং সময়মতো ব্যবস্থা নিলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

আরও পড়ুন