মা–হারা নবজাতকের ক্ষেত্রে যা করতে হবে

একটি শিশুর জন্ম হাজার খুশির সূচনাবিন্দু। আর এই আনন্দের কেন্দ্রে থাকেন মা। তিল তিল করে যাঁর গর্ভে বেড়ে উঠেছে একটি নতুন প্রাণ, তাঁর আনন্দের সঙ্গে কি আর কারও তুলনা চলে? মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধনও তাই অনন্য। তবে বন্ধন অনন্য হলেই যে অচ্ছেদ্য হবে, তা তো নয়। নিয়তির ফেরে কোনো কোনো সন্তান পুরোপুরি স্বনির্ভর হওয়ার আগেই হারিয়ে যেতে পারে মা। প্রসবকালীন কিংবা প্রসব–পরবর্তী জটিলতায় মায়ের মৃত্যু হতে পারে, এমনকি আকস্মিক দুর্ঘটনাতেও মা–হারা হতে পারে নবজাতক।

পৃথিবীর বুকে বেড়ে ওঠার সবচেয়ে বড় অবলম্বনটি হারিয়ে কী নিদারুণ অসহায় অবস্থাতেই না পড়ে একজন মানবশিশু। এমন একটি শিশুকে নিয়ে পরিবারের বাকি সদস্যরাও পড়েন বিপাকে। কীভাবে তাকে খাওয়ানো হবে, কার কাছে থাকবে, কার কাছে ঘুমাবে—ভাবনার যেন শেষ নেই। রোগ-শোক-দুর্ভাবনা কাটিয়ে উঠে শিশুটিকে বড় করে তোলাই হয়ে ওঠে এক চ্যালেঞ্জ।

শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি শিশুর বিকাশে মানসিক দিকটিও খেয়াল রাখতে হবে
ছবি: সংগৃহীত

যত্নে বেড়ে ওঠা

নবজাতক তো নিতান্তই অসহায়, পুরোপুরি নির্ভরশীল এক প্রাণ। তার জন্য মায়ের দুধের বিকল্প নেই। মা যখন নেই, তখন খুঁজতে হবে বিকল্প মা। কাছের কোনো আত্মীয়ার যদি দুধের শিশু থেকে থাকে, তাহলে তিনি হতে পারেন দুধ-মা। দুধ-মায়ের দুধ শিশুর জন্য উপকারী। কৌটার দুধ বা ফর্মুলা মিল্ক শিশুর স্বাস্থ্যহানির কারণ হতে পারে। তাই শিশুর সুস্থতার জন্য দুধ-মা আবশ্যক। নিতান্ত না পেলে ‘কৌটার দুধ’ই ভরসা।

কেবল খাওয়ানোই তো নয়, নবজাতকের চাই ওম, চাই জীবাণু থেকে সুরক্ষা। তার স্বস্তি, পরিচ্ছন্নতা, পোশাক-আশাকসহ দৈনন্দিন যাবতীয় সবকিছুর তত্ত্বাবধান করতে হবে। তাকে স্পর্শ করার আগে হাত জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে, সময়মতো গোসল, খাওয়ানো তাকে করিয়ে দিতে হবে। ছয় মাস বয়স পেরোলে দুধের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার শুরু করতে হবে নিয়মমাফিক। আর সব নবজাতককে যেমন যত্নে বড় করে তোলেন মা, তেমনি যত্ন নিশ্চিত করতে হবে। এমনটাই বলছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মনীষা ব্যানার্জী।

মনের সুষ্ঠু বিকাশ

শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি শিশুর বিকাশে মানসিক দিকটিও খেয়াল রাখতে হবে। বাড়ন্ত শিশু আস্তে আস্তে সবকিছুই বুঝতে শিখবে। ‘আহা রে, ওর মা নেই!’—আপনজনের এমন দীর্ঘশ্বাস যেন হতাশায় ডুবিয়ে না দেয় তাকে। তার কোনো প্রয়োজনকে অবহেলা করা যাবে না। কোনোভাবেই শিশু যেন নিজেকে বঞ্চিত না ভাবে। ‘সবার মা আছে, আমার তো নেই’—এমন ভাবনায় সে যাতে কষ্ট না পায়। যিনিই শিশুর মায়ের ভূমিকা পালন করুন না কেন, একেবারে প্রথম থেকেই শিশুর সঙ্গে তার একটি সুন্দর, সহজ, মসৃণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. রশিদুল হক বলেন, শিশুকে যিনি দেখভাল করছেন, তাঁর ভূমিকাটা এখানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। মা না থাকলেও মায়ের মতো ভরসা করতে একজন কাউকে যেন শিশুটি পায়। আস্থা ও ভরসার এই জায়গাটুকু না থাকলেই হতে পারে বিপত্তি। শৈশবের মানসিক বঞ্চনার কারণে একসময় সে চারপাশের পৃথিবীকে প্রচণ্ড ভীতিকর মনে করতে পারে। সে স্বাভাবিক সামাজিকতাকে এড়িয়ে চলতে পারে, হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে, নিজের অস্তিত্বকে ছোট মনে করতে পারে, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ভুগতে পারে, অল্পতেই ভেঙে পড়তে পারে, মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে পারে, এমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও তাকে পেয়ে বসতে পারে। তাই শিশুর মানসিক বিকাশের দিকে খেয়াল রাখুন ঠিকঠাক।

পারিবারিক বলয়

জীবনের বাস্তবতায় ব্যস্ত পৃথিবীতে চাইলেও হয়তো কেউ পুরোপুরিভাবে মায়ের অভাব পূরণ করতে পারেন না। এমনকি বাবার পক্ষেও সেটি সম্ভব হয়ে ওঠে না। মা–হারা সন্তানের জন্য বাবা অনেক সময় নতুন ‘মা’ নিয়ে আসেন, অর্থাৎ তিনি আবার বিয়ে করেন। কিন্তু বাড়ন্ত সন্তানের সামনে দ্বিতীয় মাকে কোন পরিচয়ে আনা হবে, সেটি নিয়ে অনেক পরিবার বিভ্রান্তিতে থাকে এবং মিথ্যার আশ্রয় নেয়। এটি কিন্তু অনুচিত। বড় হয়ে কোনো দিন সত্যটা জানতে পারলে সে আঘাত পেতে পারে। বরং শিশুর কোমল মনেই নতুন মায়ের জন্য একটি ভালোবাসার জায়গা তৈরির সুযোগ দেওয়া উচিত বলে জানালেন রশিদুল হক। অর্থাৎ শিশুর বয়স কম থাকতেই তাকে সত্যটা জানাতে হবে, অল্প অল্প করে, তার মানসিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে। শিশুর বেড়ে ওঠার দিনগুলোকে সহজ করে তুলতেই যে পরিবারে এই নতুন মায়ের আগমন হয়েছিল, ইতিবাচকভাবে বিষয়টি বুনে দিন শিশুমনে। তাহলে ভবিষ্যতে সম্পর্কে কোনো জটিলতা আসবে না।

সত্যরে লও সহজে

মা কীভাবে মারা গেলেন, একসময় তা জানতে চাইতে পারে শিশু। প্রসবজনিত জটিলতায় মায়ের মৃত্যু হয়ে থাকলে, সেটি জানার পর শিশুর মনে অপরাধবোধের সঞ্চার হতে পারে। ‘আমার জন্মের জন্যই মাকে এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হয়েছে’—এমন ভাবনা যাতে শিশুর মনে না আসে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। জীবনের স্বাভাবিকতার মধ্যেই কারও কারও মা এভাবে মারা যেতে পারেন কিংবা কারও কারও জীবনে হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটে যায়, সেটি সহজভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে, যাতে সে আঘাত না পায়।