প্রোস্টেট সুস্থ না থাকলে কী হয়, আর সুস্থ রাখতে কী করবেন
প্রোস্টেট-সংক্রান্ত সমস্যা অস্বস্তিকর তো বটেই, অনেক সময় দুশ্চিন্তার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। তবে চাইলে নিজের জীবনযাপনেই কিছু পরিবর্তন এনে প্রোস্টেট সুস্থ রাখা সম্ভব। এমনই কিছু পরামর্শ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস হাসপাতালের ইউরোলজিস্ট ডা. ক্রিশ্চিয়ান পাভলোভিচ, যিনি মূলত প্রোস্টেট ক্যানসারসহ ইউরোলজিক ক্যানসার নিয়ে কাজ করেন।
প্রোস্টেট সুস্থ না থাকলে কী হয়
প্রোস্টেট গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করলে দৈনন্দিন জীবনে নানা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। যেমন বারবার প্রস্রাবের চাপ, বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন চাপ; প্রস্রাব শুরু করতে দেরি হওয়া বা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়া; প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা; কখনো কখনো তলপেটে বা কোমরের নিচে ব্যথা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব সমস্যা বাড়তে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি হয়।
ভয়ের কথা না ভেবে শুরুতেই যদি জীবনযাপনে কিছু সচেতনতা আনা যায়, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রোস্টেট সুস্থ রাখতে করণীয়
১. ঘরোয়া খাবার ও সবজি-ফল খান
প্রোস্টেট ভালো রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিদিন কী খাচ্ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব খাবারে টাটকা সবজি, ফল, ডাল, শস্য আর ভালো চর্বি বেশি থাকে, সেসব প্রোস্টেটের জন্য উপকারী।
বাংলাদেশি খাবারের কথাই ধরুন। পাতাওয়ালা সবজি, লাউ, কুমড়া, শিম, বেগুন, গাজরের মতো মৌসুমি সবজি খান। পেয়ারা, পেঁপে, কমলা, আমলকীর মতো ফল থাকুক আপনার খাদ্য তালিকায়। ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি খান নিয়মিত।
ভাতের সঙ্গে শাকসবজি আর ডাল রাখতেই হবে। রান্নায় শর্ষের তেল বা পরিমিত সয়াবিন তেল ব্যবহার করুন। সপ্তাহে কয়েক দিন মাছ থাকুক। অন্যদিকে অতিরিক্ত লাল মাংস, ভাজাপোড়া, খুব বেশি তেল-ঝাল আর পোড়া বা ঝলসানো মাংস যতটা সম্ভব কমান। মাংস পুড়ে গেলে এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি হয়, যা ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হয়।
২. ভিটামিন ই সাপ্লিমেন্ট এড়িয়ে চলুন
অনেকেই ভাবেন, ভিটামিন খেলেই বুঝি ঝুঁকি কমবে। কিন্তু প্রোস্টেটের ক্ষেত্রে উল্টো প্রমাণও আছে। যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, যারা টানা প্রায় পাঁচ বছর প্রতিদিন ৪০০ আইইউ ভিটামিন ই সাপ্লিমেন্ট নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার হার ১৭ শতাংশ বেশি ছিল। তাই প্রোস্টেট সুস্থ রাখতে ভিটামিন ই সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় না।
৩. রোদে বেরোন, তবে বুঝেশুনে
রোদ একেবারে এড়িয়ে চলা ভালো নয়। সূর্যের আলো থেকে পাওয়া ভিটামিন ডি প্রোস্টেট সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অল্প সময় সকালে বা বিকেলের নরম রোদে থাকা উপকারী। অবশ্যই খেয়াল রাখবেন, অতিরিক্ত রোদে পুড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি যেন না হয়।
৪. বয়স অনুযায়ী পরীক্ষা করান
প্রোস্টেট ক্যানসারের স্ক্রিনিং কবে থেকে শুরু করবেন, তা নির্ভর করে আপনি ঝুঁকিপূর্ণ দলে পড়েন কি না, তার ওপর। যাঁরা উচ্চঝুঁকিতে, তাঁদের ৪০ বছর বয়স থেকেই স্ক্রিনিং নিয়ে ভাবা উচিত। যাঁদের ঝুঁকি স্বাভাবিক, তাঁদের ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে স্ক্রিনিং শুরু করার কথা বলা হয়।
যাঁরা বেশি ঝুঁকিতে আছেন—
যাঁদের প্রথম বা দ্বিতীয় ডিগ্রির আত্মীয়দের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যানসার (বিশেষ করে ছড়িয়ে পড়া বা মেটাস্ট্যাটিক), পুরুষ স্তন ক্যানসার, কম বয়সে স্তন ক্যানসার, এন্ডোমেট্রিয়াল, কোলন বা প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের ইতিহাস আছে।
যাঁদের একাধিক নিকটাত্মীয়ের এসব ক্যানসারের ইতিহাস আছে।
যাঁদের বংশগত ক্যানসার সিনড্রোম বা বিআরসিএ২-র মতো জেনেটিক ঝুঁকি আছে।
যাঁরা ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ নামের রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসেছেন।
স্ক্রিনিংয়ে সাধারণত দুটি পরীক্ষা করা হয়—ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামিনেশন (ডিআরই) এবং পিএসএ টেস্ট। পিএসএ হলো রক্তের একটি পরীক্ষা, যেখানে প্রোস্টেট-স্পেসেফিক অ্যান্টিজেনের (পিএসএ) মাত্রা মাপা হয়।
পিএসএ বেশি হলে চিকিৎসক প্রয়োজনে প্রোস্টেট এমআরআই বা ‘প্রোস্টেট হেলথ ইনডেক্স’ (পিএইচআই) নামের আরেকটি রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। পিএইচআই পিএসএর চেয়ে ঝুঁকির একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেয়। এই পরীক্ষা যুক্তরাষ্ট্রে ২০১২ সালে অনুমোদন পেয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, প্রোস্টেট ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের ভালো-মন্দ দুটি দিকই আছে। তাই কখন থেকে স্ক্রিনিং শুরু করবেন, সে সিদ্ধান্ত চিকিৎসক বা ইউরোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলেই নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।
সূত্র: জনস হপকিনস মেডিসিন