এনজিওগ্রাম ছাড়া কি হার্টের রক্তনালিতে ব্লক শনাক্ত সম্ভব

হার্টের রক্ত সরবরাহকারী প্রধান নালিগুলোর নাম করোনারি ধমনি। এই ধমনিগুলোতে ব্লক বা রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলেই করোনারি হৃদ্‌রোগ হয়। সাধারণত এক দিনে হঠাৎ করে কোনো করোনারি ধমনি সম্পূর্ণ ব্লক বা বন্ধ হয়ে যায় না। এটি দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি প্রক্রিয়া। ফলে রোগের শুরুর দিকে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। যখন রক্তনালির ব্লক একটি সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছে, তখন হৃদ্পেশিতে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং নানা উপসর্গ প্রকাশ পেতে শুরু করে।

কীভাবে বোঝা যাবে

করোনারি হৃদ্‌রোগের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো বুকে ব্যথা। এই ব্যথা সাধারণত বুকের মাঝখানে অনুভূত হয়। ভারী কাজ, সিঁড়ি ভাঙা, দ্রুত হাঁটা কিংবা দৌড়ানোর সময় এই ব্যথা বাড়তে পারে এবং বিশ্রাম নিলে কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বুকে চাপ, ভারী ভাব বা অস্বস্তিও অনুভূত হয়। ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে ঘাড়, কাঁধ, চোয়াল, বাঁ হাত কিংবা পিঠের দিকে। যদি হঠাৎ করে তীব্র বুকে ব্যথা শুরু হয়, বিশ্রামেও না কমে, দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় এবং সঙ্গে ঘাম, বমি বা বমিভাব দেখা দেয়, তবে সেটি হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। করোনারি ধমনি সম্পূর্ণ ব্লক হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঘটনা ঘটে।

ব্লক শনাক্তের উপায় কী?

হার্টের রক্তনালিতে ব্লক আছে কি না, তা কীভাবে জানা যাবে? কারও হার্ট অ্যাটাক হলে ধরেই নেওয়া যায় যে তাঁর করোনারি ধমনিতে ব্লক রয়েছে। তবে এটি একটি অনুমান মাত্র। নিশ্চিতভাবে জানতে হলে করোনারি এনজিওগ্রাম করানো প্রয়োজন। যাঁদের করোনারি হৃদ্‌রোগের উপসর্গ রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি এবং প্রয়োজনে ট্রেডমিল টেস্ট করাতে পারেন। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদ্‌যন্ত্রের কর্মক্ষমতা, রক্তস্বল্পতা কিংবা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এসব পরীক্ষায় নির্দিষ্ট করে বলা যায় না—কোন রক্তনালিতে কত শতাংশ ব্লক রয়েছে। এখানেই এনজিওগ্রামের গুরুত্ব। এনজিওগ্রামের মাধ্যমে করোনারি ধমনির ব্লক সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়। এটি হার্টের রক্তনালি পরীক্ষা করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

এনজিওগ্রাম কেন প্রয়োজনীয়

এনজিওগ্রাম সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে করা হয়, তবে এতে রোগীকে অজ্ঞান করার প্রয়োজন হয় না। রোগীর কবজি বা কুঁচকির রক্তনালি দিয়ে একটি সরু নল (ক্যাথেটার) হৃদ্‌যন্ত্রের ধমনিতে পৌঁছানো হয়। এরপর বিশেষ রঙিন তরল ব্যবহার করে এক্স-রের মাধ্যমে রক্তনালির ছবি তোলা হয়। এতে স্পষ্টভাবে জানা যায়—  

  • কোনো ব্লক আছে কি না

  • কোন ধমনিতে কোন অংশে আছে

  • কতটুকু অংশ জুড়ে বা কত শতাংশ ব্লক আছে এনজিওগ্রাম দেখে হৃদ্‌রোগবিশেষজ্ঞ সিদ্ধান্ত নেন রোগীর স্টেন্ট বা রিং লাগবে নাকি বাইপাস সার্জারি প্রয়োজন, নাকি শুধু ওষুধেই চিকিৎসা সম্ভব।

 ভুল ধারণা

অনেক সময় রোগী ও স্বজনেরা এনজিওগ্রাম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন। এর বিকল্প কিছু আছে কি না তা জানতে চান। বাস্তবে এনজিওগ্রামের বিকল্প আদর্শ কোনো পরীক্ষা নেই। অনেকের ধারণা, ইসিজি বা ইকোকার্ডিওগ্রাম স্বাভাবিক মানে হার্টে ব্লক নেই। এটিও ভুল ধারণা। এসব পরীক্ষা স্বাভাবিক থাকার পরও রক্তনালিতে উল্লেখযোগ্য ব্লক থাকতে পারে।

  • ডা. শরদিন্দু শেখর রায়, সহকারী অধ্যাপক, হৃদ্‌রোগ বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা