হঠাৎ করে এ বছর হামের প্রাদুর্ভাব বেশি হওয়ার কারণ কী?
সম্প্রতি হামের এই প্রাদুর্ভাবের জন্য আমরা কয়েকটি বিষয়কে দায়ী করতে পারি। এক. শেষ তথ্য–উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার প্রথম ডোজ সফলভাবে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আর দ্বিতীয় ডোজ বা সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়ার হার আরেকটু কম—৮২ শতাংশ।
জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞান বলে, যদি কোনো এলাকায় শতভাগ শিশু টিকা নেয় তবে সেই জনসংখ্যার শতকরা ৮৫ জন সেই নির্দিষ্ট রোগের বিপরীতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে বা ইমিউনিটি তৈরি হয়।
যেহেতু আমাদের টিকা দানের হার ৮৫ শতাংশ, তাই ধরে নেওয়া যায় যে ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু হামের বিপরীতে ইমিউনিটি গড়ে তুলতে পেরেছে। তাহলে কী দাঁড়াল? বাকি ২৭ দশমিক ২ শতাংশ শিশু নন–ইমিউন থেকে যাচ্ছে।
দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ শিশুর জন্ম হয়। যদি এদের মধ্যে ২৭ দশমিক ২ শতাংশ শিশু নন–ইমিউন থেকে যায়, তবে তার সংখ্যা প্রতিবছর ৮ লাখ ৪০ হাজার। এটা নেহাত কম নয়।
এই সংখ্যা বছরের পর বছর চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে বাড়তে কখনো যদি ৩০ লাখে পৌঁছায়, তখনই একটা বড় ধরনের ‘আউটব্রেক’ হওয়ার কথা। সম্ভবত বাংলাদেশ এখন এই সময়টা পার করছে।
দুই. হাম একটি উচ্চমাত্রার সংক্রামক রোগ। দেশে যত ধরনের সংক্রামক রোগ আছে, তার মধ্যে হামের সংক্রমণ হার অত্যন্ত বেশি। একটি শিশু আক্রান্ত হলে তার থেকে আশপাশের ১৮টি শিশু আক্রান্ত হতে পারে।
আর বাংলাদেশ জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ বলে অতিদ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমায়, হামের কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা আরও কমে যায়। ফলে হামের জটিলতাও বেশি দেখা দিচ্ছে। কারও কারও মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। তাই এই প্রাদুর্ভাবকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
এই মুহূর্তে কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে?
এই মুহূর্তে করণীয় শতভাগ শিশুর হামের টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা। একে বলে ‘সাপ্লিমেন্টারি ভ্যাকসিনেশন’। আক্রান্ত শিশুর আশপাশের বাড়িগুলোয় তো বটেই, দেশের ৯৫ শতাংশ জেলায় ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শতভাগ শিশুকে টিকা দিতে হবে।
এই কাজ জাতীয় পর্যায়ে নয়, বরং জেলাভিত্তিক করতে হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিশেষ ক্যাম্পেইনিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনতে হবে। এটা করা গেলে তবেই এই আউটব্রেক থামানো সম্ভব।
যারা আগে টিকা নিয়েছে, তারাও কি আবার টিকা নেবে?
হ্যাঁ, মহামারি ঠেকাতে হলে সব শিশুকে টিকা দিতে হবে। তবে যদি কেউ গত এক মাসের মধ্যে টিকা নিয়ে থাকে, তবে তাদের বাদ দিতে হবে। এখানে লক্ষণীয় যে টিকাদান কর্মসূচিতে হামের টিকা ৯ মাসে দেওয়া হলেও এই বিশেষ ক্যাম্পেইনে ৬ মাস বয়স থেকে ১৫ বছরের নিচে সব শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এ বিষয়ে এখনই সতর্ক পদক্ষেপ না নিলে রোগটি আরও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। সরকারের উচিত এখনই বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ে দ্রুত পর্যালোচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।
শিশু ছাড়া বড়রাও কি টিকা নিতে পারবে?
হামের টিকা বড়রাও নিতে পারবেন। তবে যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম বা যাঁরা ‘ইমিউনোকমপ্রোমাইজড’ বা যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, যেমন ক্যানসার রোগী, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নিচ্ছেন, এমন রোগী, এইচআইভি আক্রান্ত রোগী বা অন্তঃসত্ত্বা নারীরা হামের টিকা নিতে পারবেন না। সন্তান ধারণ করতে চাইছেন, এমন নারীরা টিকা নেওয়ার অন্তত এক মাস বিরতি নেওয়ার পর সন্তান ধারণের চেষ্টা করবেন।
শিশুদের টিকাদানে অভিভাবক ও জনসচেতনতা বাড়ানোর বিষয়ে কিছু বলুন।
অভিভাবকদের বলব, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ও মারাত্মক রোগ। এটি শিশুর ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে একেবারে এলোমেলো করে দেয়। হাম তাদের শরীরকে আরও নানা রকম রোগবালাইয়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় বলে নানা ধরনের জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
তাই নিজের প্রিয় সন্তানকে হামের টিকা দিতে কোনোভাবেই অবহেলা বা গড়িমসি করবেন না। কোনোরকম গুজব বা অবৈজ্ঞানিক তথ্যে বিভ্রান্ত হবেন না। এ বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা বাড়াতে ক্যাম্পেইনিং ও প্রচারমাধ্যমের ব্যবহার দরকার।