পরিবেশে শিশুর জন্য ক্ষতিকর উপাদান, প্রতিরোধে করণীয়

শৈশবেই নানা কেমিক্যালের সংস্পর্শ শিশুর দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারেফাইল ছবি

বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ২ হাজার ৮৬৩ ধরনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (এইচপিভি স্তরের) কেমিক্যাল উৎপাদিত হয়, যার প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিষক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও প্রতিরোধব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিকশিত না হওয়ায় এসব বিষাক্ত পদার্থ শরীরে সহজে নিষ্ক্রিয় করা অথবা বের করে দেওয়া সম্ভব হয় না। উপরন্তু শিশুর কোষকলা বিষ দ্রব্যের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে শৈশবেই এসব কেমিক্যালের সংস্পর্শ শিশুর দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

পরিবেশে ক্ষতিকর কেমিক্যালস

বায়ুদূষণকারী কেমিক্যালস: তেলাপোকা, বিড়াল, কুকুর ইত্যাদি অ্যালার্জেনের উৎস। বাতাসে ওজোন ও অক্সাইডস অব নাইট্রোজেন, সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনো-অক্সাইডের মাত্রা বেশি হলে শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, হাঁপানি এমনকি মৃত্যু হতে পারে।

সিসা: শিশুর দেহে সিসার পরিমাণ ১০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়াটা বিপজ্জনক। এটা হলে পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট ও মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

মারকারি: এই কেমিক্যালসের প্রতিক্রিয়ায় ত্বকে, মাড়িতে, মুখে ঘা ও মাংসপেশির অনৈচ্ছিক চালনা দেখা দেয়। স্নায়ুকোষ বেশি ক্ষতির শিকার হয়। হ্রদের মাছ বেশি মারকারিযুক্ত বলে গর্ভবতীর খাদ্যতালিকায় না রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

এসবেস্টস: শ্রেণিকক্ষের দেয়াল ও সিলিং নির্মাণে একদা বহুল ব্যবহৃত এসবেটস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

তামাকের ধোঁয়া: অন্তঃসত্ত্বা নারীর তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে গর্ভস্থ ভ্রূণের নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে। পরোক্ষ ধোঁয়ার প্রভাবে শিশু কম ওজন, অ্যাজমা, কান পাকা অসুখে ভোগে।

পেস্টিসাইডস: পোকামাকড়, মশা, মাছি, ইঁদুর মারার কেমিক্যালস মারাত্মক বিষাক্ত পদার্থ। এসব কেমিক্যাল ফলমূল ও শাকসবজির মাধ্যমে খাবারে মেশে। এতে শিশুর বমি, ডায়রিয়া, পেট ব্যথা, বিকল স্নায়ুতন্ত্রের উপসর্গ তৈরি করে।

পিসিবি, ডিডিটি, হাইড্রোকার্বন: এসব কেমিক্যাল পরিবেশে দীর্ঘ সময় মজুত থাকতে পারে। দূষণযুক্ত মাছ খেলে বা বুকের দুধে প্রবাহিত হয়ে শিশুর দেহে প্রবেশ করে। শিশু-ভ্রূণ, অল্প বয়সী শিশু বেশি ক্ষতির শিকার হয়।

হরমোনের ওপর প্রতিক্রিয়া: এসব বিষাক্ত দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ডিইএস, ডিডিটি, পিসিবিএস ও ডিমোক্সিন। অকাল বয়সে কন্যাশিশুর মাসিক শুরু, স্তন উদ্‌গমন, শুক্রাশয়ের ক্যানসার, জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রভৃতি এসবের দ্বারা ঘটতে পারে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

  • শিশুকে ঘরে তৈরি টাটকা ও তাজা খাবার খাওয়ান। ভালোভাবে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে ফলমূল খাওয়াতে হবে।

  • টিনের পাত্রে রাখা খাবার, ফাস্ট ফুডস খাওয়াবেন না। রঙিন জুস কিংবা পানীয় শিশুকে পান করানো যাবে না।

  • স্বাস্থ্যকর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ধোঁয়ামুক্ত স্কুল পরিবেশে শিশুর পড়াশোনা নিশ্চিত করার চেষ্টা করুন।

  • প্রতিদিন সকালে ট্যাপের পানি ২-৩ মিনিট ছেড়ে রেখে তারপর খেতে হবে।

অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল