৮ ঘণ্টা ঘুম কি ম্যাট্রেস কোম্পানির বানানো ধারণা? ভাইরাল দাবির সত্য-মিথ্যা

ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটি পোস্টে চোখ আটকে গেল। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিথ্যা নাকি আমাদের খাদ্য বা চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে নয়; বরং ঘুম নিয়ে! পোস্টটিতে বলা হয়েছে, মানুষের দিনে আট ঘণ্টা ঘুমানোর কোনো প্রয়োজনই নেই। এই আট ঘণ্টার নিয়ম নাকি ১৯৩৮ সালে সিমন্স বিউটিরেস্ট নামের একটি ম্যাট্রেস তৈরির কোম্পানি নিজেদের ব্যবসার প্রসারের জন্য প্রচলন করেছিল।

শুধু তা-ই নয়, সেখানে আরও দাবি করা হয়েছে, আগে মানুষ নাকি দুই ধাপে ঘুমাত। রাতে চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে দুই ঘণ্টার জন্য জেগে উঠত, এরপর আবার চার ঘণ্টা ঘুমাত।

মাঝরাতের ওই দুই ঘণ্টাকে বলা হতো ‘গড আওয়ার্স’। ইংরেজ সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ার ও অস্ট্রিয়ান সংগীতস্রষ্টা মোৎজার্ট নাকি তাঁদের সেরা কাজগুলো ওই মাঝরাতেই করেছিলেন।

এই দুই ধাপের ঘুমকে মানসিক রোগ বা ইনসমনিয়া নাম দিয়ে নাকি ফ্যাক্টরির কাজের সুবিধার্থে আট ঘণ্টার টানা ঘুমের নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

ইনস্টাগ্রামের এই পোস্টে বলা হয়েছে, মানুষের দিনে আট ঘণ্টা ঘুমানোর কোনো প্রয়োজনই নেই
ছবি: স্ক্রিনশট

এর জন্য নাকি ড. নাথানিয়েল ক্লিটম্যান নামের এক বিজ্ঞানী ম্যাট্রেস কোম্পানির টাকায় ভুয়া গবেষণাপত্রও তৈরি করেছিলেন।

ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হওয়া এই পোস্ট প্রথম দেখায় যে কারও কাছে চমকপ্রদ মনে হতে পারে। কিন্তু পাঠকের জন্য এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে বেরিয়ে এল অন্য এক চিত্র।

ভাইরাল পোস্টটি মূলত কিছু ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে ভয়ংকর কিছু মিথ্যা এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্বের এক অদ্ভুত মিশেল। চলুন, সত্য-মিথ্যার জটগুলো একে একে খোলা যাক।

আরও পড়ুন

৮ ঘণ্টার ঘুম কি ১৯৩৮ সালের আবিষ্কার

আট ঘণ্টা ঘুমের ধারণাটি কোনো কোম্পানির বিপণন কৌশল ছিল না; বরং এটি ছিল শ্রমিকদের মানবিক অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফসল
ছবি: পেক্সেলস

এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা। দিনে আট ঘণ্টা ঘুম বা বিশ্রামের ধারণার সঙ্গে কোনো ম্যাট্রেস কোম্পানির বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। এর শিকড় শিল্পবিপ্লবের সময়ের শ্রমিক অধিকার আন্দোলনে।

ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে কলকারখানায় শ্রমিকদের দিয়ে দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানুষিক পরিশ্রম করানো হতো। ১৮১৭ সালে রবার্ট ওয়েন নামের এক ওয়েলশ সমাজসংস্কারক প্রথম শ্রমিকদের জন্য একটি স্লোগান তৈরি করেন—‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিনোদন ও ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম (ঘুম)।’

তবে ওয়েন কিন্তু আট ঘণ্টার বিশ্রাম মানে শুধু ঘুমই বোঝাননি। যদিও পরে মানুষ বিশ্রাম বলতে ঘুমকেই বুঝেছে। অর্থাৎ, এই আট ঘণ্টা ঘুমের ধারণাটি কোনো কোম্পানির বিপণন কৌশল ছিল না; বরং এটি ছিল শ্রমিকদের মানবিক অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফসল।

মানুষ কি আগে দুই ধাপে ঘুমাত

ভাইরাল পোস্টের এই একটি দাবি ঐতিহাসিকভাবে সত্য। ভার্জিনিয়া টেকের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এ রজার একিরচ তাঁর ‘অ্যাট ডেজ ক্লোজ: নাইট ইন টাইমস পাস্ট’ বইয়ে দেখিয়েছেন, শিল্পবিপ্লবের আগে বৈদ্যুতিক বাতি না থাকায় মানুষ আদতেই দুই ধাপে ঘুমাত।

সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পরই মানুষ ঘুমিয়ে পড়ত। একে বলা হতো ফার্স্ট স্লিপ বা প্রথম ঘুম। মাঝরাতে তারা এক বা দুই ঘণ্টার জন্য জেগে উঠত। এ সময় মানুষ প্রার্থনা করত, বই পড়ত, প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করত বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাত। এরপর আবার ঘুমিয়ে পড়ত, যাকে বলা হতো সেকেন্ড স্লিপ।

কিন্তু বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার এবং কারখানার নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা চালু হওয়ার পর মানুষের এই অভ্যাস বদলে গিয়ে টানা ঘুমের দিকে মোড় নেয়।

দিনে আট ঘণ্টা ঘুমের নিয়মটি কোনো ম্যাট্রেস কোম্পানির ষড়যন্ত্র নয়; বরং মানুষের সুস্থতার জন্যই চিকিৎসকদের একটি আদর্শ পরামর্শ
ছবি: পেক্সেলস

শেক্‌সপিয়ার ও মোৎজার্টের গড আওয়ার্স

শেক্‌সপিয়ার তাঁর বিখ্যাত নাটকগুলো কিংবা মোৎজার্ট তাঁর সেরা সিম্ফনিগুলো মাঝরাতের ওই দুই ঘণ্টা জেগে থাকার সময় রচনা করেছিলেন—ইতিহাসে এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এটি ভাইরাল পোস্টের লেখকের সম্পূর্ণ একটি রোমান্টিক কল্পনা ও মনগড়া তথ্য।

নাথানিয়েল  ক্লিটম্যানের নামে ভুয়া গবেষণার অপবাদ

ড. নাথানিয়েল ক্লিটম্যানকে বলা হয় আধুনিক ঘুম গবেষণার জনক
ছবি: এনপিএস

এই পোস্টের সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক মিথ্যাটি বলা হয়েছে ড. নাথানিয়েল ক্লিটম্যানকে নিয়ে। তাঁকে ম্যাট্রেস কোম্পানির টাকায় ভুয়া গবেষণা করা প্রতারক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সত্যটা হলো, ড. ক্লিটম্যানকে বলা হয় আধুনিক ঘুম গবেষণার জনক। তিনি ও তাঁর ছাত্র ইউজিন আসেরিনস্কি মিলে ১৯৫৩ সালে মানুষের ঘুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, অর্থাৎ রেম স্লিপ আবিষ্কার করেন।

১৯৩৮ সালে তিনি কেন্টাকির ম্যামথ গুহায় টানা ৩২ দিন সূর্যের আলো ছাড়া সম্পূর্ণ অন্ধকারে কাটিয়েছিলেন শুধু মানুষের সার্কেডিয়ান রিদম বোঝার জন্য। এ রকম একজন নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞানীর কাজকে ম্যাট্রেস কোম্পানির বানানো ভুয়া স্টাডি বলাটা রীতিমতো হাস্যকর এবং বিজ্ঞানবিরোধীদের অপপ্রচার।

ঘুম ও মানবদেহের জৈবিক ঘড়ি নিয়ে ১৯৩৮ সালের ঐতিহাসিক পরীক্ষা। ম্যামথ গুহায় সহকারী ব্রুস রিচার্ডসনের ঘুম পরীক্ষা করছেন ড. নাথানিয়েল ক্লিটম্যান
ছবি: এনপিএস
আরও পড়ুন

ইনসমনিয়া কি আদতেই কোনো রোগ নয়

ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা কোনো সাজানো মিথ্যা নয়। এটি একটি বাস্তব চিকিৎসাবিজ্ঞান স্বীকৃত সমস্যা
ছবি: পেক্সেলস

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়াটা প্রাকৃতিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারে (যেমনটা আমাদের পূর্বপুরুষদের হতো), কিন্তু ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা কোনো সাজানো মিথ্যা নয়। এটি একটি বাস্তব চিকিৎসাবিজ্ঞান স্বীকৃত সমস্যা। মাঝরাতে ঘুম ভাঙার পর যদি কেউ পুনরায় ঘুমাতে না পারেন এবং এর ফলে তাঁর সারা দিনের কাজে ব্যাঘাত ঘটে, শারীরিক ও মানসিক অবসাদ তৈরি হয়, তখন সমস্যাটিকে চিকিৎসার পরিভাষায় ইনসমনিয়া বলা হয়।

মনে রাখবেন

মোদ্দাকথা, ভাইরাল ওই পোস্টের শেষের দিকে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং পেটে মেদ জমে। মজার ব্যাপার হলো, এই কথাগুলো আবার শতভাগ সত্য!

সুতরাং দিনে আট ঘণ্টা ঘুমের নিয়মটি কোনো ম্যাট্রেস কোম্পানির ষড়যন্ত্র নয়; বরং মানুষের সুস্থতার জন্যই চিকিৎসকদের একটি আদর্শ পরামর্শ। আপনি যদি রাতে টানা ঘুমাতে না পেরে দুই ধাপে ঘুমান এবং সকালে নিজেকে ফ্রেশ লাগে, তবে চিন্তার কিছু নেই।

ঘুম মানুষের জীবনের অত্যন্ত জরুরি বিষয়
ছবি: পেক্সেলস

এটি আপনার শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হতেই পারে। কিন্তু ভাইরাল হওয়া কোনো চটকদার পোস্ট দেখে নিজের টানা ঘুমের অভ্যাস বা চিকিৎসকের পরামর্শকে ষড়যন্ত্র ভেবে বাতিল করে দেওয়াটা হবে আপনার স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল।

ঘুম মানুষের জীবনের অত্যন্ত জরুরি বিষয়। তাই ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অর্ধেক সত্য আর অর্ধেক মিথ্যায় ভরপুর গল্পে কান না দিয়ে নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে ঘুমানোটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: বিবিসি হিস্ট্রি ম্যাগাজিন, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো মেডিসিন আর্কাইভ, হিস্ট্রি এক্সট্রা ও ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন