ডেঙ্গু প্রতিরোধে কী পরামর্শ দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, নাগরিকের কী করার আছে

২০০০ সালের পর থেকে ডেঙ্গু দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, ডেঙ্গু বেড়ে গেলে সরকার তোড়জোড় শুরু করে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ চায়। পরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে গেলে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের কথা ভুলে যায়।

২০০০ সালের পর থেকে ডেঙ্গু দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় ধরনের সদিচ্ছা দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করেন তিনি। বিএনপি সরকারের নতুন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। এ উদ্যোগে অতীতের কিছু পদক্ষেপ, উদ্যোগ বা পরামর্শ বর্তমান সরকারের কাজে লাগতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ কী ছিল

২০১৭ সালে দেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ দেখা দিলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের রোগতত্ত্ববিদ ড. কে কৃষ্ণমূর্তিকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল।

ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে ওই রোগতত্ত্ববিদ ২২ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা দলিল তৈরি করে দিয়ে যান। ‘মিড-টার্ম প্ল্যান ফর কন্ট্রোলিং অ্যান্ড প্রিভেন্টিং এডিস-বর্ন ডেঙ্গু অ্যান্ড চিকুনগুনিয়া ইন বাংলাদেশ (বাংলাদেশে এডিসবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা)’ শীর্ষক এই পরিকল্পনায় দুটি উদ্দেশ্যের কথা বলা ছিল।

প্রথমত, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের হার কমানো। দ্বিতীয়ত, ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানো। ওই দলিলে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা ছিল:

১. ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ণয় এবং রোগপ্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি মূল্যায়ন।

২. রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য-শিক্ষা-যোগাযোগবিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে ‘র‍্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠন করা জরুরি।

৩. ১২টি মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

২০১৯ সালের মধ্যে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু তখনকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ওই দলিল খুলেই দেখেননি।

আরও পড়ুন

২০১৯ সালে দেশে বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায়। ওই বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপালকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল সরকারকে এডিস মশা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য।

ওই কীটতত্ত্ববিদ একাধিক মন্ত্রণালয়ে ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে এডিস মশার চরিত্র এবং কীভাবে এই মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তা নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন ও পরামর্শ দেন।

নাগপাল বলেছিলেন, এডিস মশা ডিম পাড়ার পর এক বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। কোনো পাত্রে ডিম থাকলে এক বছরের মাথায় পানির স্পর্শ পেলে ডিম থেকে আবার মশা হয়। এডিস মশা কখনোই নর্দমায় ডিম পাড়ে না। তারা ছোট ছোট পানির আধারে ডিম পাড়তে পছন্দ করে।

নাগপাল একাধিক অনুষ্ঠানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মীদের দিয়ে এডিস মশা কমানো সম্ভব না। কর্মীরা সব মানুষের বাড়ির মধ্যে ঢোকার অনুমতি পাবেন না। অথচ এই মশা বিশ্রাম নেয় টেবিল-চেয়ার-সোফা-বিছানার নিচে, পর্দা-আলমারির পেছনে—অর্থাৎ যেখানে অন্ধকার থাকে। এই মশা হাইড্রোফিলিক, এই মশা আর্দ্রতা পছন্দ করে।

আরও পড়ুন

নাগরিকের কী করার আছে

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এ সময় একটি ভবনের নিচতলায় মশার প্রজননস্থল খুঁজছেন সিটি করপোরেশনের কর্মী ও স্কাউট সদস্যরা। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: ডিএসসিসির সৌজন্যে

দীর্ঘদিন স্বাস্থ্য খাতে সাংবাদিকতা করার সুবাদে বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে যে তথ্য পেয়েছি, তাতে ধারণা করা যায়, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলার সময়ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। অভিযান শেষ হলেও ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে, সেই নিশ্চিয়তা নেই। তাই ডেঙ্গুর বিষয়ে সচেতনতা ও সতর্কতা খুবই জরুরি।

ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো জানতে হবে। ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। পরীক্ষায় ডেঙ্গু নিশ্চিত হলে আবার চিকিৎসকের কাছে গিয়ে তাঁর পরামর্শমতো ওষুধ সেবন ও পথ্য খেতে হবে।

একটি কথা মনে রাখতে হবে, জ্বর সেরে যাওয়া মানেই ডেঙ্গুমুক্ত হওয়া নয়। এ বিষয়ে চিকিৎসক যা বলেন, তা মেনে চলতে হবে।

প্রতিটি পরিবারে চার ধরনের মানুষের প্রতি বেশি নজর রাখতে হবে: শিশু, গর্ভবতী, প্রবীণ এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা ক্যানসারের মতো দীর্ঘস্থায়ী একাধিক রোগে ভুগছেন এমন ব্যক্তি। তাঁরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়। সুতরাং জ্বর হলেই সতর্ক হতে হবে।

সরকার মশা নিয়ন্ত্রণে নেমেছে, এখন নাগরিকের উচিত তার দায়িত্ব পালন। সরকার ও সচেতন নাগরিকেরা এককাতারে হাঁটলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা যায়।

আরও পড়ুন