মস্তিষ্কের বিচিত্র ও সাময়িক জটিলতা প্রেস সিনড্রোম কী, কেন হয়, কাদের ঝুঁকি বেশি ও করণীয়
হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা কিংবা আকস্মিক খিঁচুনি—এমন লক্ষণ দেখলে আমরা সাধারণত স্ট্রোক বা স্থায়ী কোনো স্নায়বিক ক্ষতির আশঙ্কা করি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন এক বিচিত্র অবস্থা আছে, যা আপাতদৃষ্টিতে মারাত্মক মনে হলেও সঠিক সময়ে শনাক্ত করতে পারলে তা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য। একে বলা হয় ‘পোস্টেরিয়র রিভার্সিবল এনকেফালোপ্যাথি সিনড্রোম’ বা সংক্ষেপে ‘প্রেস’।
প্রেস আদতে কী
এই সিনড্রোমের নামের মধ্যেই এর বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে আছে। ‘পোস্টেরিয়র’ মানে মস্তিষ্কের পেছনের অংশ, ‘রিভার্সিবল’ মানে যা আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে এবং ‘এনকেফালোপ্যাথি’ মানে মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতা। এটি মূলত মস্তিষ্কের রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপের ফলে সৃষ্ট একটি অবস্থা। যখন রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন মস্তিষ্কের পেছনের অংশের রক্তনালিগুলো সেই চাপ সইতে না পেরে কিছুটা তরল বের করে দেয়। ফলে মস্তিষ্কের কোষে পানি জমে (এডেমা) এবং স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়।
কাদের ঝুঁকি বেশি
যেকোনো বয়সের ব্যক্তির এ সমস্যা হতে পারে, তবে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে—
উচ্চ রক্তচাপ: হঠাৎ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে।
গর্ভাবস্থা: অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে একলাম্পসিয়া বা প্রসব-পরবর্তী উচ্চ রক্তচাপের জটিলতায় এটি বেশি দেখা দেয়।
কিডনি জটিলতা: যাঁদের কিডনি বিকল হওয়ার সমস্যা আছে।
বিশেষ ওষুধ: ক্যানসারের কেমোথেরাপি বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর ব্যবহৃত ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও এটি হতে পারে।
লক্ষণ
লক্ষণগুলো সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয়—
তীব্র ও অসহ্য মাথাব্যথা।
হঠাৎ খিঁচুনি শুরু হওয়া।
দৃষ্টিশক্তি সাময়িকভাবে কমে যাওয়া বা চোখের সামনে অদ্ভুত কিছু দেখা (হ্যালুসিনেশন)।
মানসিক বিভ্রান্তি বা আচ্ছন্ন ভাব।
নির্ণয় ও প্রতিকার
এই রোগ শনাক্ত করার প্রধান উপায় মস্তিষ্কের এমআরআই। স্ক্যানে মস্তিষ্কের পেছনের অংশে বিশেষ পরিবর্তন দেখে এটি নিশ্চিত করা হয়। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, এর কোনো স্থায়ী প্রভাব সাধারণত থাকে না। কারণটি শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া গেলে রোগী সাধারণত কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। সচেতনতাই এই রোগ শনাক্তের প্রধান উপায়। উচ্চ রক্তচাপ বা গর্ভাবস্থায় যেকোনো স্নায়বিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাই এই বিচিত্র সমস্যা থেকে মুক্তির প্রধান চাবিকাঠি।
লেখক: ক্লিনিক্যাল স্ট্যাফ, নিউরোলজি বিভাগ স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।