অ্যান্ড্রোপজ—পুরুষের যে হরমোনগত পরিবর্তন নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়
‘মেনোপজ’ শব্দটি শুনলেই সাধারণত নারীদের কথা মনে আসে। তবে অনেকেই জানেন না যে পুরুষদের শরীরেও বয়সের সঙ্গে একধরনের হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে, যাকে বলা হয় অ্যান্ড্রোপজ। এটি কোনো হঠাৎ ঘটা ঘটনা নয়; বরং পুরুষের সেক্স হরমোন টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার ফলে শরীর ও মনের ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রভাব পড়ে।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে থাকে। সাধারণত ৪০ বছরের পর থেকে প্রতিবছর এই হরমোনের পরিমাণ সামান্য করে হ্রাস পায়। কারও ক্ষেত্রে এর প্রভাব খুব কম দেখা যায়, আবার কারও জীবনে পরিবর্তনগুলো বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অ্যান্ড্রোপজের অন্যতম সাধারণ লক্ষণ হলো ক্লান্তি এবং কর্মশক্তি ও উদ্যম কমে যাওয়া। আগে যে কাজ সহজ মনে হতো, তা করতে আগ্রহ বা সক্ষমতা কমে যেতে পারে। অনেকের ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে এবং আত্মবিশ্বাসও কমে যেতে পারে। যৌন আগ্রহ ও সক্ষমতা হ্রাস পাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এ ছাড়া ওজন বৃদ্ধি, বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমা, পেশিশক্তি কমে যাওয়া এবং হাড় দুর্বল হয়ে পড়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিক থেকেও এ পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পুরুষ অকারণ বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে পারেন। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে পুরুষেরা সাধারণত এসব অনুভূতি সহজে প্রকাশ করেন না। ফলে অনেকেই নীরবে কষ্ট সহ্য করেন।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি; অ্যান্ড্রোপজ কোনো রোগ নয়। এটি বয়সজনিত স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন। তবে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপ এ সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
এ অবস্থায় জীবনযাপনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম শরীরে টেস্টোস্টেরনের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাসও উপকারী। বিশেষ করে হাঁটা, সাঁতার কাটা কিংবা হালকা ব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
অনেকেই মনে করেন যে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের উদ্যম হারিয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। সঠিক যত্ন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সচেতনতার মাধ্যমে একজন পুরুষ মধ্যবয়সেও সুস্থ, কর্মক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী থাকতে পারেন। প্রয়োজন হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে হরমোন থেরাপি দেওয়া হয়, তবে তা অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করা উচিত।
আমাদের সমাজে পুরুষের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব কম হয়। ফলে অ্যান্ড্রোপজ সম্পর্কে অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। অথচ এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। কারণ, সঠিক বোঝাপড়া, পারিবারিক সহমর্মিতা ও সময়মতো চিকিৎসা মানুষের জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক ও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে।