কফি এনেমা কী, লিভার ‘ডিটক্স’ করার এই পদ্ধতি কতটা নিরাপদ? চিকিৎসক যা বলছেন

লিভারকে ‘ডিটক্স’ বা বিষমুক্ত করতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কফি এনেমা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে আলোচনা। কফি এনেমা নেওয়ার পর মারাত্মক জটিলতা হওয়ায় চিকিৎসকদের কাছেও ছুটছেন অনেকে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যেসব গবেষণা হয়েছে, সেসবের ফলাফল জানেন কি? এ বিষয়ে সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জন ডা. রেজা আহমদ–এর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম

এনেমা কী?

এনেমা হলো এমন তরল, যা পায়ুপথে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে অন্ত্র পরিষ্কার হয়
ছবি: পেক্সেলস

এনেমা হলো এমন তরল, যা পায়ুপথে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে অন্ত্র পরিষ্কার হয়। অন্ত্রে জমা থাকা মল পরিষ্কার করার জন্য চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এনেমা ব্যবহারের নির্দেশনা দেন। চিকিৎসাকাজে ব্যবহৃত এসব এনেমার বোতল ফার্মেসিতে কিনতে পাওয়া যায়। তবে ইচ্ছা করলেই যে কেউ এনেমা নিতে পারেন না।

কফি এনেমা কী?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োজনে ব্যবহৃত এনেমার কোনোটিতেই কফি থাকে না। তবে সম্প্রতি বাড়িতেই পায়ুপথে কফি প্রবেশ করিয়ে এনেমা হিসেবে ব্যবহার করছেন অনেকে
ছবি: ফ্রিপিক

চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োজনে ব্যবহৃত এনেমার কোনোটিতেই কফি থাকে না। তবে সম্প্রতি বাড়িতেই পায়ুপথে কফি প্রবেশ করিয়ে এনেমা হিসেবে ব্যবহার করছেন অনেকে। উদ্দেশ্য হলো লিভার ডিটক্স করা, অর্থাৎ শরীর থেকে টক্সিন বা ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেওয়া।

আরও পড়ুন

ঝুঁকিগুলো জানেন তো?

কফি এনেমা গ্রহণের পর নানা রকম জটিলতা নিয়ে মানুষ চিকিৎসকের কাছে ছুটে আসছেন। এমনটা যে কেবল আমাদের দেশেই হয়েছে, তা নয়। বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও মানুষ কফি এনেমার ক্ষতিকর প্রভাবে ভুগেছেন।

কফি এনেমা গ্রহণের কারণে দুজন ব্যক্তির মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রে।

এটা ঠিক যে কফি এনেমা গ্রহণে মৃত্যুঝুঁকি খুব কম। তবে যেসব জটিলতা সৃষ্টি হয়, সেসবের যেকোনো একটির কারণেই চরম ভোগান্তিতে পড়তে পারেন একজন ব্যক্তি।

  • কফি এনেমা নেওয়ার পর অন্ত্রে থাকা মল এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক তরল বেরিয়ে আসে। এই তরল কেবল পানিই নয়; বরং খাবার থেকে যে খনিজ উপাদান পাওয়া যায়, তার একটা বড় অংশ থাকে এই তরলে। তাই মারাত্মক পানিশূন্যতা এবং লবণের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।

  • এনেমা নেওয়ার সময় পায়ুপথ, মলদ্বার, এমনকি অন্ত্রের কোনো অংশেও আঘাত লাগতে পারে। এসব অংশ চিড়ে গিয়ে প্রচণ্ড অস্বস্তিকর ব্যথা হতে পারে। এ ছাড়া হতে পারে মারাত্মক প্রদাহ।

  • গরম অবস্থায় কফি এনেমা নিতে গিয়ে পায়ুপথ, মলদ্বার বা অন্ত্রের কোনো অংশ পুড়ে যেতে পারে। এভাবে পুড়ে যাওয়াকে বলা হয় ‘স্ক্যাল্ড’। পুড়ে যাওয়ার ফলে মলদ্বার সরু হয়ে যেতে পারে (রেক্টাল স্ট্রিকচার)।

  • কফি এনেমার সাহায্যে বারবার মল নিষ্কাশন করা হলে একসময় মলদ্বারের পেশির স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। এভাবে হতে পারে কোষ্ঠকাঠিন্য।

  • কফি এনেমা গ্রহণ করতে গিয়ে বাইরে থেকে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে শরীরে। এভাবে পায়ুপথ, মলদ্বার বা অন্ত্রের কোনো অংশে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে রক্তেও (সেপটিসেমিয়া)।

  • এনেমা নেওয়ার পর মল ও তরলের সঙ্গে সঙ্গে পায়ুপথ, মলদ্বার বা অন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুগুলো বেরিয়ে যেতে পারে। এ কারণেও ক্ষতিকর জীবাণুদের জন্য এসব জায়গায় আক্রমণের সুযোগ বেড়ে যায়।

  • কফি খেলে রক্তে যতটা ক্যাফেইন শোষিত হয়, পায়ুপথে নেওয়া হলে তার চেয়ে অনেক বেশি শোষিত হয়। তাই মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড়, অস্থিরতার মতো সমস্যাও হতে পারে।

আরও পড়ুন

তবু কেন জনপ্রিয়?

কফি এনেমা নিলে লিভার ডিটক্স করা যাবে কিংবা অন্য উপকার মিলবে, এর কোনো শক্তপোক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই
ছবি: ফ্রিপিক

কফি এনেমা নিলে লিভার ডিটক্স করা যাবে কিংবা অন্য উপকার মিলবে, এর কোনো শক্তপোক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবু এটি জনপ্রিয়। এর কারণ কী?

  • কফি এনেমা ব্যবহারের পর অনেকে সাময়িকভাবে সতেজ অনুভব করেন। কফিতে থাকা ক্যাফেইন যখন পায়ুপথ থেকে রক্তে শোষিত করে, তখন অনেকটা সতেজ লাগে। কাজেকর্মে উদ্যম আসে।

  • কফি এনেমা নেওয়ার পর মল বেরিয়ে যায়, সেটিও স্বস্তির কারণ।

  • পুরুষের ক্ষেত্রে কফি এনেমা গ্রহণের পর প্রোস্টেট গ্রন্থিতে কিছুটা চাপ পড়তে পারে। তাতে ভালো লাগার অনুভূতি পেতে পারেন তিনি।

  • এ ছাড়া যেকোনো ব্যক্তি যখন বিশ্বাসের সঙ্গে কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি গ্রহণ করেন, তখন মানসিক প্রশান্তিও আসে।

তাহলে শরীর ডিটক্স করবেন কীভাবে?

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, আমাদের শরীর বা শরীরের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গই ডিটক্স করার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু খাবার ও পানীয় লিভার ভালো রাখতে বিশেষ সহায়ক
ছবি: পেক্সেলস

বুঝতেই পারছেন, কফি এনেমা লিভারকে ডিটক্স করতে পারে না। বরং এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। প্রশ্ন হলো, লিভারকে তাহলে নিরাপদে ডিটক্স করার উপায় কী।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, আমাদের শরীর বা শরীরের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গই ডিটক্স করার প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াতেই আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর সব পদার্থ বেরিয়ে যায়। কাজটি করে মূলত লিভার ও কিডনি।

কারও যদি লিভার বা কিডনি বিকল হয়েও যায়, সে ক্ষেত্রেও এ ধরনের ঘরোয়া ডিটক্স পদ্ধতি কোনো উপকারে আসে না। বরং এটি সবার জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া।

আরও পড়ুন