নারী ও পুরুষের বন্ধ্যত্ব কেন হয়, চিকিৎসা কী
সাধারণত কোনো দম্পতি এক বছর বা এর বেশি সময় ধরে কোনো প্রকার জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়া নিয়মিত সহবাস এবং ৩৫ বছরের ঊর্ধ্ব দম্পতি কোনো প্রকার জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়া ৬ মাস নিয়মিত সহবাসের পরও সন্তান ধারণে ব্যর্থ হলে তবেই এ সমস্যাকে বলা হয় বন্ধ্যত্ব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, বিশ্বজুড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যত্বে ভোগেন। বাংলাদেশেও এই সংখ্যা কম নয়। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ দম্পতি কোনো না কোনোভাবে সন্তান না হওয়ার সমস্যায় ভোগেন। এটি শুধু চিকিৎসা-সংক্রান্ত সমস্যা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত সামাজিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব। আমাদের সমাজে সন্তানহীনতা এখনো একটি বড় সামাজিক চাপ। এ কারণে এখনো অন্যায় দোষারোপ, মানসিক নির্যাতন ও একাকিত্বের শিকার হন অনেক নারী। যদিও বন্ধ্যত্বের জন্য নারী-পুরুষ উভয়ই সমানভাবে দায়ী হতে পারেন।
বন্ধ্যত্ব কী
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বন্ধ্যত্বকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
১. যখন কোনো নারী কখনোই গর্ভধারণ করতে পারেননি।
২. যখন কোনো নারী পূর্বে অন্তত একবার সন্তান ধারণ করেছিলেন কিন্তু পরবর্তীকালে আর গর্ভধারণ করতে পারছেন না।
দুই ক্ষেত্রেই কারণগুলো জটিল হতে পারে—কখনো নারীজনিত, কখনো পুরুষজনিত, কখনো আবার উভয়ের মিলিত প্রভাবের কারণে।
বন্ধ্যত্বের কারণ
১. নারীদের বন্ধ্যত্বের প্রধান কারণ
ডিম্বনিষ্কাশন সমস্যা: নারীর মাসিক চক্রে প্রতি মাসে একটি করে পরিপক্ব ডিম্বাণু নির্গত হয়। যদি কোনো কারণে এই ডিম্বনিষ্কাশন (ওভুলেশন) নিয়মিত না হয়, তবে গর্ভধারণ সম্ভব হয় না। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) বা হরমোন ভারসাম্যহীনতা হলো এটির প্রধান কারণ। অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত ওজন, মুখে অতিরিক্ত লোম পিসিওএসের সাধারণ লক্ষণ।
ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যা: ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন হয় ফ্যালোপিয়ান টিউবে। এটি বন্ধ হয়ে গেলে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু একত্র হতে পারে না। বাংলাদেশে টিউব ব্লক হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো—সংক্রমণ, বিশেষত অচিকিৎসিত যৌনরোগ, যক্ষ্মা বা প্রসবজনিত সংক্রমণ।
জরায়ু বা এন্ডোমেট্রিয়ামজনিত সমস্যা: জরায়ুর ভেতরের দেয়ালে কোনো পলিপ, ফাইব্রয়েড বা জন্মগত বিকৃতি থাকলে নিষিক্ত ডিম্বাণু সেখানে স্থাপিত হতে পারে না। এতে গর্ভধারণ ব্যর্থ হয় বা বারবার গর্ভপাত হয়।
বয়সের কারণ: নারীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও মান কমে যায়। ৩৫ বছরের পর থেকে গর্ভধারণের সক্ষমতা দ্রুত কমে যায় আর ৪০ বছরের পর তা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: থাইরয়েড, প্রোল্যাকটিন, ইনসুলিন বা অন্যান্য হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে গর্ভধারণে সমস্যা হয়।
মানসিক চাপ ও জীবনযাপন: অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম, ধূমপান বা অতিরিক্ত ওজন নারীর প্রজননক্ষমতা হ্রাস করে।
২. পুরুষজনিত বন্ধ্যত্বের কারণ
বাংলাদেশে পুরুষদের বন্ধ্যত্বও এ সমস্যার একটি বড় কারণ। তবে সামাজিক ট্যাবুর কারণে অনেক পুরুষই তা স্বীকার করতে চান না।
শুক্রাণুর সংখ্যা বা মান কমে যাওয়া: অলিগোস্পার্মিয়া বা শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া এবং অ্যাজোস্পার্মিয়া বা শুক্রাণুর অনুপস্থিতি হলো সবচেয়ে বড় সমস্যা। এর কারণ হতে পারে হরমোনজনিত ত্রুটি, সংক্রমণ, টেস্টিসে আঘাত বা জেনেটিক সমস্যা।
শুক্রাণুর গতিশীলতা কমে যাওয়া: যদি শুক্রাণুর মবিলিটি বা চলাচলের ক্ষমতা কম থাকে, তবে তা ডিম্বাণু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
জীবনযাপনের প্রভাব: ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, তামাক সেবন, স্থূলতা, দীর্ঘ সময় গরম পরিবেশে থাকলে (যেমন মোটরসাইকেলচালক, ওয়েল্ডার ইত্যাদি) শুক্রাণুর মান কমে যায়।
সংক্রমণ ও যৌনরোগ: ক্লামাইডিয়া বা গনোরিয়া পুরুষ প্রজনন অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে শুক্রনালি বন্ধ করে দিতে পারে।
৩. নারী–পুরুষের মিলিত ও অন্যান্য কারণ
অটোইমিউন সমস্যা: শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা কখনো শুক্রাণুকে শত্রু হিসেবে আক্রমণ করে।
পরিবেশগত কারণ: বায়ুদূষণ, কীটনাশক, ভারী ধাতু ও প্লাস্টিকের রাসায়নিক পদার্থ প্রজননক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
দেরিতে সন্তান ধারণ: বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে শিক্ষা ও ক্যারিয়ারের কারণে অনেকে দেরিতে বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা প্রজননক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
অজানা কারণ: ১০–১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না।
বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা
১. প্রাথমিক পরীক্ষা ও পরামর্শ
চিকিৎসক প্রথমে কিছু পরীক্ষা করেন, যেমন:
রক্ত পরীক্ষা: হরমোন (এফএসএইচ, এলএইচ, টিএসএইচ, প্রোল্যাকটিন ইত্যাদি) যাচাই করা হয়।
আলট্রাসনোগ্রাফি: জরায়ু, ডিম্বাশয় ও ফ্যালোপিয়ান টিউবের অবস্থা দেখা হয়।
শুক্রাণু বিশ্লেষণ: পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা, মান ও গতি পরিমাপ করা হয়।
হিস্টেরোসালপিনগোগ্রাম (এইচএসজি)/স্যালাইন ইনফিউশন সনোগ্রাফি (এসআইএস): ফ্যালোপিয়ান টিউব খোলা আছে কি না, দেখা হয়।
এই পরীক্ষাগুলো শেষে চিকিৎসক কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করেন।
২. ওষুধ ও হরমোন চিকিৎসা: যদি দেখা যায় ডিম্বনিষ্কাশন (ওভুলেশন) ঠিকমতো হচ্ছে না, তখন কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয়। যেমন—
ডিম্বাণু উৎপাদনে সহায়ক মুখে খাওয়ার ওষুধ।
ডিম্বাণু পরিপক্ব করতে গোনাডোট্রপিন ইনজেকশন।
থাইরয়েড বা প্রোল্যাকটিনজনিত সমস্যা দূর করতে ওষুধ।
পুরুষদের হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে টেস্টোস্টেরন বা অন্যান্য হরমোনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
৩. সহায়ক প্রজননপ্রযুক্তি: যখন সাধারণ চিকিৎসায় ফল পাওয়া যায় না, তখন এই আধুনিক পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করা হয়।
ইন্ট্রাইউটেরাইন ইনসেমিনেশন (আইইউআই): শুক্রাণু প্রক্রিয়াজাত করে সরাসরি নারীর জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। সহজ ও ব্যয় কম বলে প্রাথমিক স্তরে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি।
ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ): ডিম্বাণু ও শুক্রাণু শরীরের বাইরে ল্যাবরেটরিতে নিষিক্ত করা হয়, তারপর সেই ভ্রূণটি জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। এটি সাধারণত ‘টেস্টটিউব বেবি’ নামে পরিচিত।
ইনট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন (আইসিএসআই): শুক্রাণুর মান যখন খুব খারাপ হয়, তখন একটি শুক্রাণু সরাসরি একটি ডিম্বাণুর মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। আইভিএফের উন্নত সংস্করণ বলা যায়।
সার্জারি: ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক থাকলে বা জরায়ুর ভেতরে কোনো পলিপ, ফাইব্রয়েড বা গঠনগত সমস্যা থাকলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ঠিক করা হয়।
জীবনযাপন পরিবর্তন
চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাপনে পরিবর্তন আনাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রজননক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে, এমন কিছু পরামর্শ:
ধূমপান, মদ্যপান ও তামাক সেবন সম্পূর্ণ পরিহার করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন। বিশেষ করে শাকসবজি, ফলমূল, ডিম, মাছ ও বাদাম।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
স্থূলতা কমান। অতিরিক্ত বা কম ওজন—উভয়ই গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করে।
সংক্রমণ এড়াতে নিরাপদ যৌন আচরণ অনুসরণ করুন।
মানসিক সহায়তা ও পরামর্শ
কেবল শারীরিক নয়, মানসিক ও আবেগগত বিষয়েও গভীর প্রভাব ফেলে বন্ধ্যত্ব। অনেক নারী বিষণ্নতা, আত্মসম্মানহানি বা আত্মঘাতী চিন্তার শিকার হন। তাই কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তা প্রয়োজন, দরকার পারিবারিক সহযোগিতা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সচেতনতা। প্রত্যেক দম্পতিকে জানতে হবে, বন্ধ্যত্ব কোনো পাপ বা লজ্জার বিষয় নয়; এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য শারীরিক সমস্যা। সময়মতো সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দম্পতিরা সন্তান লাভ করতে পারেন।
লেখাটি ‘বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৫’ থেকে নেওয়া