প্রবীণদের যত্নে ওষুধের বাইরেও যে বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি
প্রবীণদের সুরক্ষা, বার্ধক্যজনিত সমস্যা এবং অধিকার নিশ্চিত করতে ১৯৯১ সাল থেকে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে পালন করে জাতিসংঘ। বাংলাদেশ সরকার এ বছর প্রবীণ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে, ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।
গড় আয়ু বাড়ার ফলে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বেড়েছে। আর বেশির ভাগ বয়স্ক মানুষ গ্রামাঞ্চলে বাস করেন। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক পরিষেবা এবং কাজের সুযোগ কম।
তাই বয়স্কদের পর্যাপ্ত যত্ন এবং সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একাকী (সিঙ্গল) প্রবীণদের সংখ্যা।
একটি গবেষণার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ৯৫ শতাংশ বয়স্ক ব্যক্তির বেশির ভাগই একাধিক স্বাস্থ্য জটিলতায় ভোগেন, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ। অনেকে স্বাস্থ্যসেবা পেলেও একাকিত্বে ভুগে মারা যান। সব দিক দিয়েই তাই দেশের প্রবীণদের নিয়ে বিশেষভাবে ভাবা জরুরি হয়ে পড়েছে।
দেশে প্রবীণদের সংখ্যা
নানা কারণে দেশে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি ছাড়াও পুষ্টিকর খাবার, জীবনযাপনের পরিবর্তনে বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৪ বছর।
তবে ২০২৫ সালে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের এক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের পুরুষদের গড় আয়ু ৭৪ বছর আর নারীদের ৭৭ বছর। আবার দেশে প্রবীণদের সংখ্যাও বেড়েছে।
বাংলাদেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের হার ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে ৬০ বছরের বেশি হলেই যেহেতু প্রবীণ হিসেবে গণনা করা হয়, সেই হিসাবে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী ৯.৫ ভাগ।
সেই হিসাবে দেশে এখন ১ কোটি ৬৬ লাখের বেশি প্রবীণ মানুষ বাস করছেন।
প্রবীণদের সুরক্ষা, বার্ধক্যজনিত সমস্যা এবং অধিকার নিশ্চিত করতে ১৯৯১ সাল থেকে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে পালন করে জাতিসংঘ। বাংলাদেশ সরকার এ বছর প্রবীণ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে, ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।
প্রবীণদের যত্ন
১ কোটি ৬৬ লাখের বেশি মানুষের এই বিশেষ গোষ্ঠীকে সুস্থ রাখতে দরকার নানা রকম উদ্যোগ। যার মধ্যে সংগত কারণেই বয়স্ক স্বাস্থ্যসেবা বা জেরিয়াট্রিক কেয়ার এখন সময়ের দাবি।
জেরিয়াট্রিক সিনড্রোম বলতে মূলত মানবদেহের সামষ্টিক কার্যক্ষমতার ক্ষয়িষ্ণু অবস্থাকে বোঝায়। বয়োবৃদ্ধ রোগীরা সাধারণত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বৈকল্য, শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, হাড়ক্ষয়, স্মৃতিভ্রষ্টতা, ইনফেকশন, অপুষ্টি, ক্যানসার, প্রস্রাব–পায়খানা ধরে রাখতে না পারাসহ বহু রোগব্যাধিতে ভুগে থাকেন।
তাই তাঁদের চিকিত্সাসেবাও হওয়া উচিত বিশেষ যত্ন ও ভালোবাসা দিয়ে। বিশেষ করে অন্য রোগীদের মতো একইভাবে এই জনগোষ্ঠীকে সেবা দিলে হবে না। তাঁদের জন্য দরকার বিশেষায়িত সেবা।
বাংলাদেশের প্রবীণেরা সবচেয়ে বেশি যেসব রোগে মারা যান ২০২১ সালে তার একটি তালিকা প্রকাশ করে ‘বিবিসি বাংলা’। সেখানে বলা হয়, দেশে সবচেয়ে বেশী প্রবীণ মারা যান হৃদ্রোগে। দ্বিতীয় শীর্ষ কারণ ব্রেন স্ট্রোক, তৃতীয় কারণ শ্বাসতন্ত্রের অসুখ, এর পরের অবস্থানে আছে যথাক্রমে ডায়াবেটিস ও কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা।
জীবনযাপন
বয়স্ক মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক। সুষম ও সহজপাচ্য খাদ্য গ্রহণ, পরিমিত শরীরচর্চা, দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম, নিয়মিত হেলথ চেকআপ, পুষ্টিবিদদের পরামর্শে খাদ্যাভ্যাস, ফিজিওথেরাপি ইত্যাদিতে মনোযোগ দিতে হবে।
এই বিষয়গুলো প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রবীণদের ঘুমের ওষুধ যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়া উচিত, না হলে তাঁদের জটিলতা বাড়তে পারে।
পুষ্টিতে বিশেষ নজর
এই বয়সে পেশিক্ষয় ঠেকাতে যথেষ্ট প্রোটিন দরকার। মাছ, ডিম, সবজি, ফলমূল, আঁশ–জাতীয় খাবার, বাদাম, ভিটামিন খাদ্যতালিকায় অপরিহার্য। অতিরিক্ত শর্করা, চর্বি–জাতীয় খাদ্য বর্জন করা উচিত।
হাড়ক্ষয় রোধ করতে যথেষ্ট পরিমাণ ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি গ্রহণ করতে হবে। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ২টার মধ্যে সূর্যের আলো গায়ে মাখা, দুধ বা টক দই খাওয়া খুবই উপকারী।
শরীরের পাশাপাশি নিতে হবে মনের খোঁজ
অনেক সময় আমরা অভ্যাসের কারণে দিনের পর দিন বাড়িতে থাকা বয়স্ক মানুষটিকে বিশেষভাবে খেয়াল করি না। নিজের কাজের ব্যস্ততায় বয়স্ক মা-বাবার কাছে বসে কথা বলাটা জরুরি মনে করি না। এতে মা-বাবা দিনের পর দিন একাকিত্বে ভুগতে থাকেন।
তাই শুধু নিয়মিত ওষুধ কিনে দিলেই প্রবীণদের প্রতি কর্তব্য শেষ নয়। বয়স্ক ব্যক্তিরা যাতে নিজেকে অবহেলিত মনে না করেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় থাকলে মানসিক অবসাদ কমে যায়।
বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন, শিশুদের সঙ্গে সময় কাটালে প্রবীণদের মন ভালো থাকে। তাঁদের সঙ্গে প্রতিদিন কিছুটা সময় গল্প করা, বাড়ির শিশুদের সময় কাটাতে উৎসাহ দেওয়া, তাদের প্রয়োজন শোনা জরুরি।
নিয়মিত শহরের ছাদবাগান, পার্কে নিয়ে গেলে প্রবীণেরা আনন্দিত হন। তাঁদের মন ভালো রাখতে এই ধরনের অভ্যাসের চর্চা করা যেতে পারে।
নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, কেয়ার হোম, হসপিস সেন্টার ইত্যাদির মাধ্যমে কম্প্রিহেনসিভ জেরিয়াট্রিক কেয়ার সার্ভিস প্রদান করতে হবে।
যত্ন ও সতর্কতা
বয়স্কদের আবাসস্থলের নিরাপত্তা বড় ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করে। তাঁদের ঘরে পর্যাপ্ত আলো–বাতাস থাকতে হবে। ঘরের মেঝে বা সিঁড়ি পিচ্ছিল থাকা যাবে না। টয়লেটে রেলিং ব্যবহার করা যেতে পারে। মেঝে শুকনা রাখতে হবে। সেখানে অ্যান্টি-স্লিপ ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে।
ডা. শামীমা শারমীন, সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিন, বিআইএইচএম জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা