শিশু কেন খাবার খেতে চায় না
অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, ‘সন্তান কিছুই খেতে চায় না’, ‘নতুন খাবার দেখলে ভয় পায়’; কিন্তু কখনো কখনো এ আচরণ শুধু খুঁতখুঁতে স্বভাব নয়; এটি হতে পারে অ্যাভয়ডেন্ট রেসট্রিকটিভ ফুড ইনটেক ডিজঅর্ডার বা এআরএফআইডি নামের একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে শিশু–কিশোরেরা খাবার গ্রহণে প্রচণ্ড অনীহা বা ভয় অনুভব করে। এটি একটি খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধি। তবে এটি ওজন কমানো বা শরীরের গঠন নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে নয় (যা অ্যানোরেক্সিয়াতে দেখা যায়); বরং এর পেছনে থাকে খাবারের প্রতি চরম অরুচি বা ভয়।
যেসব কারণে এটা হয়
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এআরএফআইডি মূলত তিনটি প্রধান কারণে হতে পারে। প্রথমত, সংবেদনশীলতা। খাবারের রং, গন্ধ, স্বাদ বা টেক্সচার ( যেমন খুব নরম বা দানাদার) সহ্য করতে না পারা। দ্বিতীয়ত, ভয় বা আতঙ্ক। আগে কখনো খাবার গলায় আটকে যাওয়া বা বমি হওয়ার মতো ভয়ের অভিজ্ঞতা থেকে খাবার গিলতে ভয় পাওয়া। তৃতীয়ত, আগ্রহের অভাব। খাবারের প্রতি আকর্ষণ না থাকা ও দ্রুত পেট ভরার অনুভূতি।
যেসব লক্ষণ দেখা যায়
শিশু নতুন খাবার দেখলে বিরক্ত হয়, ভয় পায় বা কান্না করে। বয়স অনুযায়ী শিশুর ওজন বা উচ্চতা না বাড়াও একটি লক্ষণ। মারাত্মক পুষ্টিহীনতা ( যেমন রক্তস্বল্পতা) দেখা দিতে পারে। সামাজিক অনুষ্ঠান বা বন্ধুদের সঙ্গে খেতে খুবই অস্বস্তি বোধ করে।
চিকিৎসা ও থেরাপি
এআরএফআইডি মোকাবিলায় কেবল জোরাজুরি করে খাবার খাওয়ানো সমাধান নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত চিকিৎসাপদ্ধতি। ফ্যামিলি বেজড থেরাপি দেওয়া যেতে পারে, যেখানে পরিবারকে শেখানো হয়, কীভাবে চাপের পরিবেশ ছাড়াই শিশুকে নতুন খাবারের সঙ্গে পরিচয় করানো যায়। অকুপেশনাল থেরাপি যাদের সংবেদনশীলতার সমস্যা আছে, তাদের খাবারের টেক্সচারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। আরেকটি হলো পুষ্টি ব্যবস্থাপনা। এ ক্ষেত্রে ঘাটতি পূরণে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া হয়।
অভিভাবকদের করণীয়
চাপ নয়, ধৈর্য ধরতে হবে। জোর করে খাওয়ানো সমস্যা বাড়াতে পারে। ছোট ছোট এক্সপোজার বা নতুন খাবার খাওয়ানোর আগে শিশুকে দেখতে, ছুঁতে ও গন্ধ নিতে উৎসাহ দিন। রুটিন তৈরি করুন। নির্দিষ্ট সময়ে শিশুর খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। অল্প অগ্রগতিরও প্রশংসা করুন। একটি শিশু যখন খাবার এড়িয়ে চলে, তখন তাকে ‘নাটক করছে’ বলে এড়িয়ে যাওয়া সহজ; কিন্তু এর পেছনে থাকতে পারে গভীর ভয়, অস্বস্তি বা মানসিক সংগ্রাম। তাই বোঝা, সময় দেওয়া ও সহানুভূতি, এ তিনটি বিষয় হতে পারে আপনার সন্তানের সুস্থতার প্রথম ধাপ।
ডা. ইন্দ্রাণী ঘোষ, শিশু–কিশোর মনোরোগবিশেষজ্ঞ