ক্যানসারের তথ্য রোগীকে কতটা জানানো উচিত
কারও ক্যানসার ধরা পড়েছে, রোগটি ছড়িয়ে গেছে, চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফল আসছে না, অথবা রোগটি আর সম্পূর্ণ নিরাময়ের পর্যায়ে নেই। এ রকম পরিস্থিতিতে রোগী ও তার স্বজনদের কীভাবে এই খারাপ সংবাদ বলা হবে, কতটুকু বলা হবে, রোগী নিজে কতটুকু নিতে পারবেন—এ নিয়ে প্রায়ই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ব্রেকিং ব্যাড নিউজ। চিকিৎসকদের প্রায়ই এ ধরনের সংকটে পড়তে হয়।
কোনো একটা রোগের সংবাদ দেওয়া মানে শুধু রিপোর্টের ফলাফল বলে দেওয়া নয়। এটি একটি মানবিক, সংবেদনশীল এবং দায়িত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
একজন রোগী যখন ক্যানসারের মতো একটি রোগের খবর শোনেন, তখন তাঁর মনে ভয়, হতাশা, অবিশ্বাস, রাগ, কান্না, এমনকি নীরবতা বা বিষণ্নতা চলে আসতে পারে। তাই এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া চিকিৎসার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
করণীয়
একজন ক্যানসার রোগীর জানা উচিত, তাঁর রোগ কোন পর্যায়ে আছে, চিকিৎসার লক্ষ্য কী, চিকিৎসায় কী লাভ হতে পারে, কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং বিকল্প কী আছে। কারণ, এই তথ্যের ওপর নির্ভর করেই তিনি নিজের পরবর্তী জীবন, পরিবার, অর্থনীতি এবং মানসিক প্রস্তুতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিশ্বের অনেক দেশে এই কঠিন সংবাদ জানানোর জন্য চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের শেখানো হয় কীভাবে শান্ত পরিবেশে, সহজ ভাষায়, ধীরে ধীরে, রোগীর মানসিক অবস্থা বুঝে খারাপ খবরটি খুলে বলতে হয়।
রোগীকে একা করে দেওয়ার পরিবর্তে বলা যায়, ‘পরিস্থিতি কঠিন, কিন্তু আমরা আপনার পাশে আছি।’
অনেক দেশে ধাপে ধাপে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। প্রথমে নিরিবিলি পরিবেশ তৈরি করা হয়। রোগী আগে কতটুকু জানেন, তা বোঝা হয়। তারপর রোগী কতটুকু জানতে চান, তা জিজ্ঞেস করা হয়। এরপর সহজ ভাষায় মূল তথ্য বলা হয়।
রোগীর আবেগ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। একেবারে শেষে পরবর্তী করণীয় পরিষ্কারভাবে জানানো হয়। অর্থাৎ খারাপ খবর দেওয়ার পরও রোগী যেন দিশাহারা না হয়ে যান, সেটিই প্রধান লক্ষ্য।
শেষ কথা
বাংলাদেশে এই চর্চা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। চিকিৎসক, নার্স, কাউন্সেলর এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। শুধু আধুনিক যন্ত্র, নতুন ওষুধ বা উন্নত হাসপাতাল থাকলেই ক্যানসার চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয় না।
রোগীর সঙ্গে সৎ, মানবিক এবং পরিষ্কার যোগাযোগও আধুনিক চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ। খারাপ খবর বলা মানে আশা শেষ করে দেওয়া নয়; বরং সত্যকে মানবিক ভাষায় বলা। রোগীকে বাস্তবতা বুঝতে দেওয়া, যাতে পরিবার প্রস্তুত হতে পারে।
অনেক সময় চাইলে রোগী চিকিৎসার কোনো পদ্ধতি নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। বিকল্প বাছাই করতে পারেন। তাই রোগীকে কিছু জানাবেন না—এই আবেগ সর্বদা কার্যকরী নয়।
ডা. আরমান রেজা চৌধুরী, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা