আমিষের জন্য মাছ কি মাংসের চেয়ে ভালো

মাছ–মাংস খাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে শরীরে আমিষের চাহিদা পূরণ করাছবি: প্রথম আলো

মাছে–ভাতে বাঙালি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের পাত্র থেকে যেন মাছের উপস্থিতি কিছুটা কমে যাচ্ছে। মাছের জায়গা দখল করে নিচ্ছে মাংস। মাংসের মধ্যে রেড মিট’ বা লাল মাংসের উপস্থিতিই যেন বেশি।

মাছ–মাংস খাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে শরীরে আমিষের চাহিদা পূরণ করা। এর পাশাপাশি আমরা বেশ কিছু জরুরি পুষ্টি উপাদানও পেয়ে থাকি। তাই মাছ–মাংস দুটিই আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাংসের চেয়ে মাছের উপকারিতা একটু বেশি।

লাল মাংসে ঝুঁকি

লাল মাংসে চর্বি (ফ্যাট) বা খারাপ চর্বির পরিমাণ মাছের চেয়ে বেশি থাকে। এতে কত শতাংশ চর্বি থাকে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। এটি নির্ভর করে প্রাণীর কোন অংশের মাংস, প্রাণীর বয়স, প্রাণীর খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির ওপর। গরুর মাংসে গড়ে ২২ শতাংশ চর্বি থাকতে পারে। এর বড় অংশই খারাপ চর্বি। অপর দিকে মাছে গড়ে ১০ শতাংশ চর্বি থাকে, যার একটা বড় অংশই ভালো চর্বি।

  • লাল মাংসে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকায় রক্তের কোলেস্টেরল ও এলডিএলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তনালি ও হৃদ্‌পিণ্ডে ব্লকের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

  • চর্বি বেশি খেলে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

  • বেশি মাংস খেলে ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে।

  • লাল মাংসে ফাইবার কম থাকে, তাই কোষ্ঠকাঠিন্য ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

  • লাল মাংসে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকায় রক্তচাপ বাড়ে, ফলে স্ট্রোক ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

  • কিডনির জটিলতা থাকলে লাল মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে রক্তের ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়তে পারে।

তবে লাল মাংসে পর্যাপ্ত পরিমাণে জিংক, সেলেনিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, ভিটামিন বি২, ভিটামিন বি৩, ভিটামিন বি৬ এবং ভিটামিন বি১২ পাওয়া যায়। তাই রক্তস্বল্পতা নিরাময়ে এবং হাড় ও দাঁতের গঠনে লাল মাংস খুব কার্যকর। তবে সপ্তাহে এক থেকে সর্বোচ্চ দুই দিন পরিমিত পরিমাণে তা খাওয়া যাবে।

মাছ কেন ভালো

  • মাছে যে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে, তাকে ভালো চর্বি বলে। মাছে পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে। তার মধ্যে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

  • ইকোসাপ্যানটয়িক অ্যাসিড ও ডোকাহেক্সানোয়িক অ্যাসিড নামের দুটি প্রধান ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শুধু মাছেই পাওয়া যায়। এটি শিশুদের মস্তিষ্ক গঠনে ও বয়স্কদের মস্তিষ্কের সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর।

  • মাছের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তে কোলেস্টেরল ও এলডিএল বা ক্ষতিকর চর্বির পরিমাণ কমায়। ফ্যাটি লিভার, স্ট্রোক ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও কমায়।

  • রক্তে উপকারী চর্বি এইচডিএলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে মাছ। এটি হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ব্লক তৈরিতে বাধা দেয়।

  • মাছে ফাইবার বেশি থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য আর কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়।

  • মাছে সোডিয়ামের পরিমাণ কম থাকে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এতে স্ট্রোক ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমে।

  • গবেষণায় প্রমাণিত যে যাঁরা নিয়মিত মাছ খান, তাঁদের ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার রোগ হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক কম থাকে।

তাই প্রতিদিনের খাবারে অবশ্যই কিছু মাছ রাখার চেষ্টা করা উচিত। প্রতিদিন খাবারে মাছ রাখলে স্ট্রোক এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি ৫০-৭০ শতাংশ কমে যায়। হৃদ্‌রোগের রোগীদের জন্য মাছ একটি আদর্শ খাবার। আমিষের উৎস হিসেবে লাল মাংসও খারাপ নয়, তবে বয়স ৪৫-৫০ বছর পার হলেই এই মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।

  • মো. ইকবাল হোসেন, সিনিয়র পুষ্টি কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল

আরও পড়ুন