রোজায় প্রোবায়োটিক কেন জরুরি

স্বাস্থ্যকর ইফতার–সচেতনতার শুরু পরিবারের সঙ্গে। পরিমিত আহার ও প্রশান্ত ইবাদতের প্রতিশ্রুতি। মডেল: অভি ও প্রমাছবি: কবির হোসেন

রমজানে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর ইফতার ও সাহরিতে খাবারের ধরনে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারে নজর দেওয়া উচিত। ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবারের কারণে অনেকেরই হজমে গোলমাল, কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস বা পেটফাঁপার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এ ধরনের শারীরিক অস্বস্তি দূর করতে পুষ্টিবিদেরা প্রোবায়োটিক বা উপকারী ব্যাকটেরিয়াসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

শরীরের অন্ত্রে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া থাকে, যার মধ্যে কিছু উপকারী এবং কিছু ক্ষতিকর। প্রোবায়োটিক হলো সেই সব ‘বন্ধু ব্যাকটেরিয়া’ যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ পেট খালি থাকায় হজমপ্রক্রিয়া কিছুটা ধীর হয়ে যায়।প্রোবায়োটিক–সমৃদ্ধ খাবার যেমন টক দই বা বাটার মিল্ক অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষা করে হজমের ক্ষমতা বাড়ায়। এটি কেবল খাবার হজমেই নয়, বরং শরীরকে পুষ্টি শোষণে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য প্রোবায়োটিক অত্যন্ত কার্যকরী।

যেভাবে কাজ করে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, প্রোবায়োটিকস হলো জীবন্ত ‘মাইক্রো-অর্গানিজম’ বা মাইক্রোবায়োম যা বেশি পরিমাণে খেলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় থাকে। এটা আমাদের অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে যা অন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের জন্য খুবই জরুরি। এটা হজমে সাহায্য করে এবং গাঁট দূর করে।

অধ্যাপক এম আখতারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট
প্রোবায়োটিকস হলো জীবন্ত মাইক্রো-অর্গানিজম যা পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটে। এটি অন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এটি হজমে সাহায্য করে এবং পেটের অস্বস্তি বা গাঁট দূর করে।
অধ্যাপক এম আকতারুজ্জামান, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তাই ইফতার বা সাহ্‌রিতে যেকোনো এক সময়ে টক দই খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে প্রিবায়োটিক হিসেবে খাবারে শাকসবজি রাখার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি সাধ্যমতো থাকতে পারে ফলমূল। তবে ভাজাপোড়া না খেলেই ভালো, বলছেন এই পুষ্টিবিদ। থাকতে পারে ছোলা এবং ধুলা ছাড়া পরিষ্কার মুড়ি। কেউ চাইলে চিড়াও খেতে পারেন ইফতারে।

রোজায় প্রোবায়োটিক খুব জরুরি বলে মনে করেন নেসলে বাংলাদেশের পুষ্টিবিদ সামিনা জামান কাজরী। প্রথম আলোকে তিনি জানান, প্রোবায়োটিকস খারাপ ব্যাকটেরিয়াকে অন্ত্রে থাকতে দেয় না। বন্ধু ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করে। রোজায় অনেকের হজমের সমস্যা হয়। এ ধরনের সমস্যাগুলো দূর করতে সাহায্য করে প্রোবায়োটিক।

তাই প্রোবায়োটিক গ্রহণ করতে ইফতারে দই বা লাচ্ছি, দিই–চিড়া কিংবা দইমাখা সালাদ খাওয়া যায়। এটা তাৎক্ষণিক ফাইবারের উৎস হতে পারে। চিনি বা লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে যাওয়া উচিত। ডাবের পানি খাওয়া যায়। বিভিন্ন আঁশযুক্ত ফল খাওয়া যায়। ওটসের খিচুড়ি খাওয়া যায় ডিম দিয়ে।

সাহ্‌রিতে আমিষ হিসেবে মাছের ঝোল বা লাউয়ের সঙ্গে মাছের তরকারি খাওয়া যায়। তবে বেশি মসলা দিয়ে রান্না করা মাংস না খাওয়ার পরামর্শ দিন সামিনা জামান কাজরী। ইচ্ছা অনুযায়ী ভাত বা রুটি খাওয়া যায়। পালংশাক ও পুঁইশাকের মতো সবুজ সবজিও প্রোবায়োটিকের ভালো উৎস। তাই যেকোনো সবজি রাখা যায় সাহ্‌রিতে।

কতটুকু প্রয়োজন

পুষ্টিবিদ এম আখতারুজ্জামান বলছেন, রোজায় সাহ্‌রি বা ইফতারে এককাপ পরিমাণ টক দই খাওয়া যায়। শাকসবজি থাকতে পারে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম পর্যন্ত। আর ফলের পরিমাণ হতে পারে ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত। তবে কিছুতেই বাসি বা পচা খাবার খাওয়া যাবে না। বাইরের ধুলাবালুমিশ্রিত খাবারও এড়িয়ে যেতে বলছেন তাঁরা। পরিমাণমতো পরিষ্কার পানি খেতে হবে।

প্রোবায়োটিক গ্রহণ করতে ইফতারে দই বা লাচ্ছি, দিই–চিড়া কিংবা দইমাখা সালাদ খাওয়া যায়। এটা তাৎক্ষণিক ফাইবারের উৎস হতে পারে। চিনি বা লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে যাওয়া উচিত। পালংশাক ও পুঁইশাকের মতো সবুজ সবজিও প্রোবায়োটিকের ভালো উৎস।

পুষ্টিবিদদের মতে, শুধু হজমপ্রক্রিয়া নয়, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ঠিক রাখার পাশাপাশি প্রদাহ কমাতেও পর্যাপ্ত প্রোবায়োটিক দরকার।

সুস্থভাবে রোজা রাখতে বাসি বা পচা খাবার পুরোপুরি বর্জন করা উচিত। শুধু হজম নয়, শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে রোজার ডায়েটে প্রোবায়োটিক রাখা এখন সময়ের দাবি।