শিশুর সুরক্ষায় টিকা কেন দেবেন, কখন দেবেন
একটি সুস্থ–সবল প্রজন্ম গড়তে শিশুদের সময়মতো টিকাদান বা ইপিআই কার্যক্রমের কোনো বিকল্প নেই। জন্মের পর থেকে নির্দিষ্ট বয়সে সঠিক টিকা শিশুকে ভয়াবহ সব সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করে।
টিকাদানের সময়সূচি
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে শিশুকে ১০টি রোগের বিরুদ্ধে টিকা দেওয়া হয়।
১. জন্মের পরপরই: যক্ষ্মা রোধে বিসিজি টিকা।
২. ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে: পেন্টাভ্যালেন্ট (ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টঙ্কার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি/হেপ-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জি/হিব), ওপিভি (পোলিও) এবং পিসিভি (নিউমোনিয়া)। এ ছাড়া ৬ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে ইনজেকটেবল পোলিও (এফআইপিভি) দেওয়া হয়।
৩. ৯ ও ১৫ মাসে: হাম ও রুবেলা (এমআর) প্রতিরোধের জন্য দুই ডোজ টিকা।
এ ছাড়া টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধের জন্য সরকার সম্প্রতি টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) ইপিআই শিডিউলে যুক্ত করেছে। শিশুদের বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে এই টিকা এক ডোজ দেওয়া হয়।
জরায়ুমুখ ক্যানসার টিকা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসজনিত (এইচপিভি) জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে দেওয়া হয়। মূলত পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণিপড়ুয়া ছাত্রীদের অথবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কন্যাশিশুদের এই টিকা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে নারীদের যত রকমের ক্যানসার হয়, এর মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসারে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। সময়মতো এই টিকা নিলে ভবিষ্যতে এই ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় শতভাগ কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের (১৫ থেকে ৪৯ বছর) ধনুষ্টঙ্কার বা টিটেনাস থেকে সুরক্ষা দিতেও টিকা দেওয়া হয়। এর পাঁচটি ডোজ দেওয়া হয়, যা মূলত মা ও হবু সন্তান—উভয়কেই প্রাণঘাতী ধনুষ্টঙ্কার থেকে রক্ষা করে।
ডোজ মিস হলে করণীয় ও ঝুঁকি
কোনো কারণে টিকা দেওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ পার হয়ে গেলে বিচলিত না হয়ে দ্রুত কাছের টিকাদান কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। ডোজ মিস হলে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সম্পূর্ণ তৈরি হয় না, ফলে যেকোনো সময় ওই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মনে রাখবেন, দেরি হলেও না নেওয়ার চেয়ে টিকা নেওয়া অনেক ভালো।
বুস্টার ডোজের প্রয়োজনীয়তা
কিছু টিকার কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে কমে আসতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে পুনরায় সক্রিয় বা শক্তিশালী করতে বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হয়। যেমন ধনুষ্টঙ্কার বা ডিপথেরিয়ার সুরক্ষায় পরবর্তী সময়ে বুস্টার ডোজ রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করে।
সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
টিকা দেওয়ার পর সাময়িকভাবে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা স্বাভাবিক। যেমন—
টিকা দেওয়ার স্থানে সামান্য ফুলে যাওয়া বা লাল হওয়া।
হালকা জ্বর বা শরীর ম্যাজম্যাজ করা।
শিশুর সামান্য কান্নাকাটি বা অস্থিরতা।
এসব লক্ষণ সাধারণত এক-দুই দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে অতিরিক্ত জ্বর বা খিঁচুনি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
টিকাদান কেবল ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। আপনার শিশুকে সময়মতো টিকা দিন এবং পঙ্গুত্ব ও অকালমৃত্যুমুক্ত একটি সুন্দর পৃথিবী গড়তে সহায়তা করুন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ