ইটিং ডিজঅর্ডার—খাবার নিয়ে অতি সচেতনতা যখন মনোরোগের লক্ষণ
‘ইটিং ডিজঅর্ডার’ একধরনের মানসিক লড়াই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এটি কেবল খাবারের প্রতি অনীহা নয়, বরং এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট।
এই সমস্যা কেন হয়
গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটালের এই যুগে কিশোর-কিশোরীদের মনের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব অনেক। সারা দিন স্ক্রিনে নিখুঁত শরীরের ছবি দেখতে দেখতে তারা নিজেদের স্বাভাবিক শরীরকে ‘অযোগ্য’ ভাবতে শুরু করে, হীনম্মন্যতায় ভোগে।
জার্নাল অব চাইল্ড সাইকোলজি অ্যান্ড সাইকিয়াট্রি (২০২৫)–এর গবেষণা বলছে, বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তন এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা কিশোর-কিশোরীদের ভুল খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে তারা বাস্তবতার চেয়ে পর্দার অবাস্তব সৌন্দর্যের মোহে বেশি প্রভাবিত হয়।
লক্ষণগুলো চিনুন
আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫ সালের ইটিং ডিজঅর্ডার গাইডলাইন অনুযায়ী, মা-বাবা হিসেবে আপনাকে নিচের লক্ষণগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খেয়াল করতে হবে—
সন্তান কি খাবার নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে পড়ছে? যেমন: বারবার ক্যালরি মাপা বা শর্করাজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া।
সবার সঙ্গে বসে না খেয়ে কি সে একা বা লুকিয়ে খাচ্ছে?
খাওয়ার পর কি সে ওজন কমানোর জন্য অতিরিক্ত ব্যায়াম বা অস্বাস্থ্যকর কোনো পদ্ধতি বেছে নিচ্ছে?
শরীরের গঠন নিয়ে সারাক্ষণ হীনম্মন্যতায় ভোগা বা নিজেকে অন্যদের চেয়ে ছোট মনে করছে কি?
উত্তরণের উপায়
ইটিং ডিজঅর্ডার থেকে মুক্তি পেতে ভালোবাসা ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার সমন্বয় প্রয়োজন। কিছু কার্যকর পদক্ষেপ হলো—
পারিবারিক সমর্থন: কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে ‘ফ্যামিলি বেজড ট্রিটমেন্ট’ সবচেয়ে কার্যকর। সন্তানকে দোষারোপ না করে তার খাবারের প্লেট সাজানো থেকে শুরু করে মনের কথা শোনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
মানসিক কাউন্সেলিং: কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির মাধ্যমে তাদের মনের ভুল ধারণাগুলো ভাঙা হয়। তাদের শেখানো হয় যে একজন মানুষের মূল্য তার ওজনে নয়, বরং তার যোগ্যতায়।
ডিজিটাল ডিটক্স: কৃত্রিম সৌন্দর্যের পেছনে না ছুটে বাস্তব জীবনের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে তাদের সচেতন করা জরুরি।
শেষ কথা, খাবার যেন আতঙ্কের কারণ না হয়, বরং তা যেন হয় পুষ্টি ও আনন্দের উৎস। জোরপূর্বক কিংবা ভয় তৈরি করে খাবারের জন্য চাপ দেওয়াও সঠিক নয়। সন্তানের আচরণে সামান্য পরিবর্তন দেখলেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষ, সহকারী অধ্যাপক ও শিশু–কিশোর মনোরোগবিশেষজ্ঞ