ওষুধ নয়, প্রয়োজন মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ, সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং কী বলছে
অসুস্থ হলে আমরা সাধারণত চিকিৎসকের কাছে ছুটে যাই; পরীক্ষা করাই, ওষুধ খাই। কিন্তু সব অসুস্থতার সমাধান কি ওষুধে মেলে? একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা, আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, বাসস্থানের সমস্যা কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—এসবও মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। অথচ এসব সমস্যার চিকিৎসা প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধ দিয়ে করা যায় না। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং ধারণাটি।
কী এই সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং?
সহজ ভাষায়, সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং হলো মানুষকে তাঁর স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য বন্ধু, ব্যক্তি, সংগঠন, কার্যক্রম বা কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল একাডেমি ফর সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিংয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর লক্ষ্য হলো মানুষের প্রয়োজন ও পছন্দ বুঝে তাঁকে এমন সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা, যা তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক। সামাজিক সংযোগ উন্নত করাও এর লক্ষ্য।
ধরা যাক, একজন বয়স্ক মানুষ দীর্ঘদিন একা থাকছেন। তাঁর কোনো বড় শারীরিক অসুস্থতা নেই, কিন্তু নিঃসঙ্গতার কারণে বিষণ্ন হয়ে পড়ছেন। চিকিৎসক তাঁকে শুধু অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট না দিয়ে একজন সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং লিংক ওয়ার্কারের কাছে পাঠাতে পারেন।
সেই কর্মী তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, তিনি কী করতে পছন্দ করেন, তাঁর কী প্রয়োজন এবং কোন ধরনের সহায়তা তাঁর জন্য উপযোগী।
এরপর তাঁকে স্থানীয় বন্ধুত্বমূলক গ্রুপ, বাগান করার দল, ছবি আঁকা বা শিল্পচর্চার ক্লাস কিংবা কোনো কমিউনিটি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
একইভাবে ঋণের চাপে থাকা কাউকে আর্থিক পরামর্শকেন্দ্রে, চাকরি হারানো কাউকে কর্মসংস্থান সহায়তা কর্মসূচিতে কিংবা ব্যায়াম করতে আগ্রহী কাউকে স্থানীয় হাঁটা বা শরীরচর্চার গ্রুপে যুক্ত করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, এখানে ‘প্রেসক্রিপশন’টি কোনো ওষুধের নয়; সম্পর্ক, অংশগ্রহণ, অর্থপূর্ণ কাজ এবং কমিউনিটির সঙ্গে সংযোগের। ইতিমধ্যে গবেষণায় এটি প্রামণিত যে একাকিত্বের সঙ্গে মস্তিষ্ক ও হার্টের নানা ধরনের জটিলতার গভীর সম্পর্ক আছে। দীর্ঘ সময় (অন্তত পাঁচ বছর বা তার বেশি) একা থাকার সঙ্গে মস্তিষ্কের সমস্যা ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
‘সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং’ আদতে কতটা কার্যকর?
গবেষণায় এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। ২০২২ সালে প্রকাশিত কিছু গবেষণায় মানসিক স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও জীবনমানের উন্নতি পাওয়া গেলেও অধিকাংশ গবেষণায় পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা ছিল।
২০২৪ সালের একটি সিস্টেম্যাটিক রিভিউ দেখিয়েছে, কোন ধরনের সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং কার জন্য এবং কোন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর, তা বোঝার জন্য আরও শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ২০২২ থেকে ২০২৬ সালে প্রকাশিত ৮টি উল্লেখযোগ্য গবেষণার ৫টিতে স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিংয়ের প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে সর্বশেষটি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ‘নেচার’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।
শেষ কথা
সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিংকে ‘সব সমস্যার সমাধান’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি চিকিৎসাব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষের সামাজিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি পদ্ধতি। তবে এটা স্পষ্ট যে সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিংকে অগ্রাহ্য করারও কোনো সুযোগ নেই।
সূত্র: সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং একাডেমি