ডেঙ্গু রোগীর জ্বর কমার পর যে বিষয়গুলোয় সতর্কতা দরকার

ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশাফাইল ছবি

যেকোনো সংক্রমণ বা জ্বরে সবাই মনে করে, জ্বর কমেছে মানে রোগী সুস্থ হচ্ছে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা। অনেকের ক্ষেত্রে তা সত্য হলেও, ডেঙ্গু রোগীর জন্য জ্বর নামার সময়টিই হতে পারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় শুরু হতে পারে ক্রিটিক্যাল ফেজ, যখন প্লাজমা লিকেজ শুরু হয়।

যেসব গুরুতর জটিলতা হতে পারে

প্লাজমা হলো রক্তের তরল অংশ; রক্তকোষের বাইরে যে তরল থাকে সেটাই প্লাজমা। গুরুতর ডেঙ্গুতে শরীরের সূক্ষ্ম রক্তনালির দেয়াল সাময়িকভাবে বেশি ভেদ্য হয়ে পড়ে। ফলে রক্তনালি থেকে প্লাজমা বেরিয়ে আশপাশের টিস্যু, ফুসফুসের চারপাশ বা পেটের ভেতরে জমতে পারে। এতে রক্তসঞ্চালনে কার্যকর রক্তের পরিমাণ কমে যায় এবং রক্ত ঘন হয়ে আসে। প্লাজমা লিকেজ বেশি হলে রক্তচাপ ও টিস্যুতে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে ডেঙ্গু শক হতে পারে।

ডেঙ্গু শক মানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন না পাওয়া। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে কিডনি, লিভার, মস্তিষ্ক ও হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়া এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।

এ কারণেই ডেঙ্গু রোগীর হেমাটোক্রিট পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এটি রক্তে লোহিত রক্তকণিকার অনুপাত নির্দেশ করে। প্লাজমা বেরিয়ে গেলে রক্ত ঘন হয় ও হেমাটোক্রিট বাড়তে পারে। সাধারণত সবাই প্লাটিলেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, কিন্তু ডেঙ্গুর তীব্রতা ও জটিলতা বুঝতে হেমাটোক্রিট বেশি সহায়ক।

শুধু রক্তে প্লাটিলেট কত আছে সেটা দেখে ডেঙ্গুর তীব্রতা বিচার করা ঠিক নয়। রোগী ও স্বজনদের দৃষ্টি প্রায়ই প্লাটিলেটের সংখ্যায় আটকে থাকে। কিন্তু হেমাটোক্রিটের পাশাপাশি রক্তচাপ, পালস প্রেশার, প্রস্রাবের পরিমাণ, পেরিফেরাল সার্কুলেশন ও রোগীর সামগ্রিক অবস্থাও দেখতে হয়। হেমাটোক্রিট বাড়তে থাকলে তা প্লাজমা লিকেজের ইঙ্গিত হতে পারে।

ডেঙ্গু চিকিৎসায় ফ্লুইড ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমাধান কেবল ‘স্যালাইন দেওয়া’ নয়। কম ফ্লুইড যেমন বিপজ্জনক, তেমনি অতিরিক্ত ফ্লুইডও ক্ষতিকর। প্লাজমা লিকেজের সময় পর্যাপ্ত ফ্লুইড না পেলে রক্তসঞ্চালনের পরিমাণ কমে গিয়ে রোগীর শক ও অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে। আবার অতিরিক্ত শিরায় ফ্লুইড দিলে পরে ফ্লুইড ওভারলোড, ফুসফুসে পানি জমা, শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে। রক্তনালি থেকে বেরিয়ে যাওয়া তরল শরীর থেকে হারিয়ে যায় না। লিকেজ বন্ধ হলে সেই তরল আবার রক্তসঞ্চালনে ফিরে আসে। তখন আগে থেকে দেওয়া অতিরিক্ত স্যালাইন বিপদ বাড়াতে পারে।

সতর্কতা

তাই মূলনীতি হলো সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণ ফ্লুইড এবং ঘন ঘন রোগীর অবস্থা পুনর্মূল্যায়ন। যে রোগী মুখে পর্যাপ্ত তরল নিতে পারছেন, তাঁর সব সময় শিরায় ফ্লুইড দরকার না–ও হতে পারে। আবার যাঁদের উল্লেখযোগ্য প্লাজমা লিকেজ আছে, তাঁদের হিসাব করে আইসোটোনিক ফ্লুইড দিতে হতে পারে। অনেক রোগী জ্বর কমার পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর আবার খারাপ হন। আসলে জ্বর নামার সময়ই ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার ক্রিটিক্যাল ফেজ শুরু হতে পারে। জ্বর কমার পর তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক ঝিমুনি বা অস্থিরতা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, রক্তপাত, মাথা ঘোরা বা প্রস্রাব কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

  • ডা. তারেক সালাহ্উদ্দিন, ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, বাংলাদেশ ক্যানসার অ্যান্ড প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা