দিনরাত এসিতে থাকার কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কি
বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এয়ারকন্ডিশনার (এসি) এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বাসা, অফিস, গাড়ি—সবখানেই এসির ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু দিনরাত এসিতে থাকলে কি শরীরের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে?
প্রথমেই বলা দরকার, এসি নিজে ক্ষতিকর নয়; সমস্যা তৈরি হয় অতিরিক্ত বা ভুল ব্যবহারে। দীর্ঘ সময় ঠান্ডা পরিবেশে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কিছুটা ব্যাহত হতে পারে। হঠাৎ গরম থেকে ঠান্ডায় বা ঠান্ডা থেকে গরমে গেলে শরীরে চাপ পড়ে। ফলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা হালকা জ্বরের মতো অনুভূতি হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে সর্দি-কাশি কিংবা সাইনাসের সমস্যাও বেড়ে যায়।
এসি ব্যবহারের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে শরীরের আর্দ্রতার ওপর। এসি বাতাসের আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ঠোঁট ফেটে যাওয়া কিংবা চোখে জ্বালাপোড়া হতে পারে। যাঁরা দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে ‘ড্রাই আই’ সমস্যাও বেশি দেখা যায়। একই সঙ্গে অজান্তেই শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন তৈরি হতে পারে, কারণ ঠান্ডা পরিবেশে সাধারণত তৃষ্ণা কম লাগে।
শ্বাসযন্ত্রের ক্ষেত্রেও কিছু ঝুঁকি রয়েছে। এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার না করলে সেখানে ধুলা, ফাঙ্গাস ও জীবাণু জমে যেতে পারে। এই দূষিত বাতাস দীর্ঘদিন শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে অ্যালার্জি, হাঁপানি বা অন্যান্য শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের আগে থেকেই শ্বাসনালির সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ছাড়া দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডা পরিবেশে থাকলে পেশি ও জয়েন্টেও প্রভাব পড়তে পারে। অনেকের ঘাড়, কাঁধ বা হাঁটুতে ব্যথা অনুভূত হয়। একে অনেক সময় ‘এসি-ইনডিউসড মাসল স্টিফনেস’ বলা হয়। যাঁরা দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।
তবে এসির ইতিবাচক দিকও রয়েছে। প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোক, অতিরিক্ত ঘাম ও পানিশূন্যতা থেকে এটি সুরক্ষা দেয়। আরামদায়ক ঠান্ডা পরিবেশ ভালো ঘুমেও সহায়ক। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতেও এসি ভূমিকা রাখে।
তাই মূল বিষয় হলো ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সবচেয়ে উপযোগী। দীর্ঘ সময় এসিতে থাকলে মাঝেমধ্যে খোলা বাতাসে যাওয়া ভালো। পর্যাপ্ত পানি পান, ত্বক ও চোখের যত্ন নেওয়া এবং এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি। রাতে সরাসরি ঠান্ডা বাতাস শরীরে না লাগানো এবং হালকা কাপড় বা চাদর ব্যবহার করাও ভালো অভ্যাস।
সবশেষে বলা যায়, এসি আমাদের জীবনকে আরামদায়ক করেছে ঠিকই, তবে সচেতন ব্যবহার না করলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে শরীরে পড়তে পারে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা উপভোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতন থাকাও জরুরি।