ভুলভাবে কান পরিষ্কার করতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনছেন না তো

আমরা অনেকেই হাতের কাছে কটন বাড, দেশলাইয়ের কাঠি বা বব পিন—যা-ই পাই, সেটা দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে কান খোঁচাতে শুরু করি। আমাদের ধারণা, এতেই বুঝি কানের সব ময়লা পরিষ্কার হচ্ছে। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, এত দিন ধরে যা সঠিক মনে করে এসেছেন, তা আদতে আপনার কানের ক্ষতি করছে!

সাময়িক আরাম লাগলেও কান পরিষ্কার করা ক্ষতিকর
ছবি: প্রথম আলো

পরিসংখ্যান দেখলেও চোখ কপালে ওঠার মতো। বিশ্বজুড়ে কটন বাড বা কটন সোয়াবের বাজার রমরমা। ২০২৪ সালেই এর বাজার ছিল ৭৯৫ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২৮ মিলিয়ন ডলারে!

প্রতিবছরই এই কান খোঁচানোর কাঠি বিক্রির হার বাড়ছে। অথচ আপনি যদি একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞাসা করেন; তিনি বলবেন, কটন বাড বা ওই জাতীয় কিছু কানের ভেতরে ঢোকানো হলো কানের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর কাজ।

তাহলে এই ভুল ধারণা এল কোত্থেকে? সমস্যাটা আদতে আমাদের বোঝাপড়ায়। কান পরিষ্কার বলতে আমরা যা বুঝি, আর চিকিৎসাবিজ্ঞান যা বলে, তার মধ্যে আকাশপাতাল তফাত।

কান নিজেই নিজেকে পরিষ্কার করে

আমাদের কান একটা স্বয়ংক্রিয় সেলফ-ক্লিনিং মেশিনের মতো। কানের ভেতরে সিলিয়া নামে অতি ক্ষুদ্র লোম থাকে। আর থাকে ইয়ার ওয়াক্স, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে সেরুমেন। সোজা বাংলায় যাকে আমরা বলি ‘কানের খইল’।

আর অনেকেই এই কানের খইলকে ময়লা ভেবে বের করে ফেলতে চান। অথচ নাক–কান–গলা বিশেষজ্ঞদের মতে, কানের খইল থাকাটা স্বাভাবিক এবং জরুরি। এসব কানে থাকাই ভালো। কারণ, এটা কানকে ভেজা রাখে, বাইরের ধুলাবালি ও জীবাণু আটকে দেয় এবং কানকে সুস্থ রাখে।

কানের ভেতরের ওই ছোট লোমগুলো (সিলিয়া) অনবরত নড়াচড়া করে খইল ও ময়লাকে কানের গভীর থেকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ কান নিজেই নিজের ময়লা বের করে দেয়। সেখানে আমাদের জোর করে সাহায্য করার কোনো দরকারই নেই।

আরও পড়ুন

কটন বাড যখন ভিলেন

যখনই আপনি কটন বাড বা অন্য কিছু কানে ঢোকান, তখন আদতে ময়লা বের হয় না, বরং উল্টোটা হয়। কটন বাড ময়লা বা মোমকে আরও ঠেলে কানের গভীরে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে সিলিয়ার নাগাল নেই। ফলে কান প্রাকৃতিকভাবে সেটা বের করতে পারে না।

বারবার খোঁচানোর ফলে কানের নরম মোমগুলো ভেতরে গিয়ে জমাট বেঁধে পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। তখন সেটা বের করা আরও কঠিন ও বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। আর সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো কানের পর্দার ক্ষতি। কটন বাড একটু এদিক-সেদিক হলেই কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে। এমনটা হলে সারা জীবনের জন্য বধির হয়ে যেতে পারেন।

যখনই আপনি কটন বাড বা অন্য কিছু কানে ঢোকান, তখন আদতে ময়লা বের হয় না, বরং উল্টোটা হয়
ছবি: পেক্সেলস

তাহলে নিরাপদে কান পরিষ্কার করবেন কীভাবে?

কান পরিষ্কার করার সঠিক ও নিরাপদ কিছু উপায় নিচে দেওয়া হলো—

১. বাইরের অংশ পরিষ্কার করুন

কানের ভেতরের অংশ নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। আপনি শুধু কানের বাইরের অংশটুকু পরিষ্কার রাখুন। গোসলের সময় নরম তোয়ালে বা কাপড় হালকা গরম পানি ও সাবান দিয়ে ভিজিয়ে কানের বাইরের ভাঁজগুলো এবং কানের পেছনের অংশ মুছে নিন। এটুকুই যথেষ্ট।

২. কটন বল ব্যবহার করুন ভিন্নভাবে

যাঁদের কানে প্রাকৃতিকভাবেই খুব বেশি ময়লা জমে, তাঁরা কটন বাড ব্যবহারের বদলে কটন বল বা সাধারণ তুলা ব্যবহার করতে পারেন। তুলাটা হালকা গরম পানি, সাধারণ স্যালাইন ওয়াটার বা হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডে ভিজিয়ে নিন।

এরপর মাথা একপাশে কাত করে (কানের ফুটো ওপরের দিকে রেখে) কয়েক ফোঁটা পানি কানে দিন। কটন বল বা তুলা কিন্তু কানের ভেতরে ঢোকাবেন না, পানি কানের ভেতরে ঢোকাতে শুধু এটি ব্যবহার করবেন।

এক মিনিট ওভাবেই থাকুন, যাতে পানিটা কানের মোমের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এরপর মাথা উল্টো দিকে কাত করুন। দেখবেন পানির সঙ্গে গলে যাওয়া ময়লা বেরিয়ে আসছে। তখন বাইরের অংশটা টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলুন। তবে সাবধান, খুব বেশি পানি দেবেন না। এতে ইনফেকশন হতে পারে। আর কানের পর্দায় সমস্যা থাকলে এই পদ্ধতি অনুসরণ করবেন না।

আরও পড়ুন

৩. ইয়ার ড্রপ

ফার্মেসিতে কিছু ইয়ার ড্রপ পাওয়া যায়। এসবে সাধারণত হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড থাকে। এই ড্রপগুলো কানের শক্ত মোমকে নরম করতে সাহায্য করে। ফলে সহজেই ময়লা বেরিয়ে আসে।

৪. হেডফোন ব্যবহার

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁরা সবসময় ইয়ারবাড ব্যবহার করেন, তাঁদের কানে ময়লা জমার প্রবণতা বেশি। তাই সম্ভব হলে কানের ওপর দিয়ে পরা যায় এমন হেডফোন ব্যবহার করুন। এতে কানে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং ময়লা কম জমে।

৫. বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন

যদি দেখেন কানে ব্যথা হচ্ছে, চুলকানি কমছে না কিংবা কানে কম শুনছেন, তবে নিজে ডাক্তারি করতে যাবেন না। সোজা একজন নাক–কান–গলা বিশেষজ্ঞের কাছে যান। তাঁদের কাছে বিশেষ ধরনের ছোট যন্ত্র, সাকশন মেশিন এবং মাইক্রোস্কোপ থাকে। তাঁরা নিরাপদে কানের পর্দার কোনো ক্ষতি না করেই জমানো ময়লা বের করে দিতে পারেন।

প্রকৃতি আমাদের কানকে এমনভাবেই তৈরি করেছে, যাতে সে নিজের যত্ন নিজেই নিতে পারে
ছবি: পেক্সেলস

শেষ কথা

তাই কানে কটন বাড ঢোকানোর আগে দুবার ভাবুন। কানের যত্ন নিন, কিন্তু কানের ওপর জবরদস্তি করবেন না। মনে রাখবেন, প্রকৃতি আমাদের কানকে এমনভাবেই তৈরি করেছে, যাতে সে নিজের যত্ন নিজেই নিতে পারে।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন