বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ

স্ট্রোকের চিকিৎসায় নিউরো-ইন্টারভেনশনের বর্তমান প্রেক্ষাপট কী? ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজর চেষ্টা করা হয় এসকেএফ নিবেদিত স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসায় অন্তরক্তনালীয় মেকানিক্যাল থ্রম্বেক্টমি ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট’ শিরোনামে ৬ মে প্রচারিত হয় বিশেষ পর্বে। বিষয় ছিল: বাংলাদেশে স্ট্রোকের চিকিৎসায় নিউরোইন্টারভেনশনের বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

ডা. নাদিয়া নিতুলের সঞ্চারনায় অতিথি ছিলেন ডা. শিরাজী শাফিকুল ইসলাম (উপরে ডানে) ও ডা. কাজী মহিবুর রহমান (নিচে বাঁয়ে)

আলোচনা করেন ডা. শিরাজী শাফিকুল ইসলাম, স্ট্রোক ও ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজিস্ট এবং সহযোগী অধ্যাপক, ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল এবং ডা. কাজী মহিবুর রহমান, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল। সঞ্চালনায় ছিলেন ডা. নাদিয়া নিতুল।

বাংলাদেশে এই চিকিৎসাপদ্ধতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডা. মহিবুর রহমান বলেন, ২০০৩ সালে সোসাইটি অব নিউরোডাইমেনশনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়, সেখানে একজন ভারতীয় চিকিৎসক অংশগ্রহণ করেন। ডা. শাকিল হোসেন। তিনিই প্রথম নিউরো ইন্টারভেনশনের ধারণাটি বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশে নিউরোডাইমেনশনের ১৩টি কর্মশালা হয়।

ডা. কাজী মহিবুর রহমান

পরে আমাদের চিকিৎসকেরা ভারতে গিয়ে ডা. শাকিল হোসেনের তত্ত্বাবধান ছাড়াও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ট্রেনিং নিয়ে আসেন। এরপর বাংলাদেশে দুই বিশেষজ্ঞ ডা. দীন মোহাম্মদ এবং ডা. বদরুল আলমের অধীনে নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে ক্যাথল্যাবসহ নিউরোডাইমেনশন বিভাগ চালু করা হয়। আমাদেরে এখানে ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, তবে প্রতিকূলতাও কম নেই।

তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, স্ট্রোক দুই রকম। এর একটি রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে বা রক্তক্ষরণ হয়ে ঘটে। এ ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল থ্রম্বেক্টমির জন্য রোগীকে ৬ ঘণ্টার ভেতরে চিকিৎসা দিতে হয়, যেটা আমরা অনেক সময় করতে পারি না। আরেকটি পদ্ধতি আছে, শিরার ভেতরে ইনজেকশন দিয়ে রোগীর পঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস করার চেষ্টা করা হয়। এই হলো স্ট্রোকের চিকিৎসায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা।’

স্ট্রোকের চিকিৎসায় কী কী ভাবে নিউরোইন্টারভেনশন করা হয়ে থাকে? এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. শিরাজী বলেন, ‘হেমারেজিক স্ট্রোক হলে আগে ধরে নেওয়া হতো মস্তিষ্কের কোনো নালি ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এটি থামাতে মস্তিষ্ক কেটে নালিটি কেটে ফেলা হতো বা সার্জিক্যাল ক্লিপিং করে বন্ধ করা হতো। অনেকেই এটি চান না​ যেহেতু ইনফেকশন বা আইসিইউতে থাকার বিষয় চলে আসে।

ডা. শিরাজী শাফিকুল ইসলাম

কিন্তু নিউরো ইন্টারভেনশনে বা রক্তনালির ভেতর দিয়ে গিয়ে ক্ষরণটি কয়েলিং বা এন্ডোভাসকুলার এমবোলাইজেশনের মাধ্যমে অথবা এভিএম করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে রোগী দু-এক দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। আর ইস্কেমিক স্ট্রোকের জন্য মেকানিক্যাল থ্রম্বেক্টমির মাধ্যমে জমাট রক্তকে বের করে নিয়ে আসা হয়। নালি সরু হয়ে গেলে রিং পরিয়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা হচ্ছে। চিকিৎসার এই পদ্ধতিগুলোকেই আমরা নিউরোইন্টারভেনশন বা এন্ডোভাসকুলার নিউরোলজিকাল থেরাপি বলছি।’

ডা. মহিবুর রহমান যোগ করেন, ‘সার্জারির বদলে নিউরোইন্টাভেনশন পদ্ধতি ব্যবহারের সুবিধা-অসুবিধা দুটিই আছে। পদ্ধতিটি খুবই ব্যয়বহুল। কয়েলিং করতে শুধু ম্যাটেরিয়ালের খরচ দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। সুবিধা হলো, কেউই মাথা কেটে চিকিৎসা করতে চায় না। মাথা না কেটেই সবাই চিকিৎসা করতে চায়। সামনে আশা করি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই খরচ কমে আসবে। তবে এই পদ্ধতির সবচে বড় সুবিধা হলো, পায়ের শিরা দিয়ে সরাসরি মাথায় চিকিৎসা করা যায়, বিশ্বজুড়ে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসায় মৃত্যুর হার মাত্র ১ শতাংশ। চিকিৎসার দু-তিন দিনের মাথায় রোগী হেঁটে বাসায় চলে যায়। পরবর্তী ফলোআপেও দেখা গেছে, রোগীর মাথার রক্তনালি শতভাগ সুস্থ হয়েই কাজ করছে।’

দেশে এই চিকিৎসাপদ্ধতির ভবিষ্যৎ অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি ও উপাদানের সহজলভ্যতা এবং দক্ষ চিকিৎসক

তবে দেশে এই চিকিৎসাপদ্ধতির ভবিষ্যৎ অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি ও উপাদানের সহজলভ্যতা এবং দক্ষ চিকিৎসক। যদি এই বিষয়ে নিউরোসার্জনরা নিবেদিতভাবে নিয়োজিত থাকেন, সমর্থন দেন, অবশ্যই এই পদ্ধতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমানের চিকিৎসার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন, তাঁর সমর্থনে এই চিকিৎসাপদ্ধতি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

নিউরো ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা না নিয়ে রোগী শুধু ওষুধ খেলে ঝুঁকি কতখানি থাকতে পারে? ডা. শিরাজী বলেন, আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসা নিলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশের মতো। কিন্তু চিকিৎসা না নিলে ১ মাসের মধ্যে ৩০ শতাংশ, ৬ মাসের মধ্যে ১৫ শতাংশ আর ১ বছরে ৭ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে থাকে। ওষুধ খেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর সাময়িক নিরাময় হয় কিন্তু পরে আরও বড় স্ট্রোক হতে পারে। তাই এন্ডোভাসকুলার চিকিৎসা গ্রহণ করাটাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। তবে এই চিকিৎসার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। এক বা দেড় বছর পর সার্জারি করালে রক্তনালি হয়তো সারানো যাবে, কিন্তু রক্তক্ষরণের ফলে মস্তিষ্কের যে ক্ষতি তা পূরণ করা সম্ভব হয় না।

তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে স্ট্রোক প্রতিরোধ করার। কোনো কারণ ছাড়াই বয়স বেশি হলে স্ট্রোক হতে পারে, ওটা আমরা কোনোভাবেই আটকাতে পারব না। কিন্তু শুরু থেকেই সচেতনভাবে কিছু বদভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। ধূমপান ত্যাগ করতে হবে, হাইপার টেনশন ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলা, হাঁটা ও শারীরিক কসরতে মনোযোগ দেওয়াও ভীষণ জরুরি।