ভালোবাসার কথা বলতে না পেরে কষ্টে আছি

পাঠকের কাছ থেকে মনোজগৎ, ব্যক্তিজীবন ও সন্তান পালনের মতো সমস্যা নিয়ে ‘পাঠকের প্রশ্ন’ বিভাগে নানা রকমের প্রশ্ন এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম নির্বাচিত একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবার।

মেহতাব খানম

প্রশ্ন: আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বয়স ২২ বছর। গত ২৬ নভেম্বর আমি লঞ্চে ঢাকা থেকে পটুয়াখালী যাই। ডেকে আমার কাছাকাছিই ছিল একটি মেয়ে, সঙ্গে তার মা। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিল সে। মেয়েটির সঙ্গে তার আরও দুজন বন্ধু ছিল, ছেলে—তারাও পরীক্ষার্থী। ছেলে দুটির সঙ্গে কথা বলে জানলাম, তাদের সবার বাসাই গাজীপুর। মেয়েটার সঙ্গে আমার কোনো ধরনের কথা হয়নি। শুধু অনেকবার চোখাচোখি হয়েছে। ওইটুকু দেখেই আমার মেয়েটিকে অসম্ভব ভালো লেগে যায়। বলতে পারেন আমি মেয়েটির প্রেমে পড়ে গিয়েছি। লঞ্চেই অনেকবার ভেবেছি মেয়েটিকে সরাসরি প্রস্তাব দেব। কিন্তু তখন মনের ভেতর একটা ভয় কাজ করছিল, যদি মেয়েটি আমাকে না করে দেয়, তাহলে খুব খারাপ লাগবে। তা ছাড়া মেয়েটির মা তার পাশেই ছিলেন। ভেবেছি, মেয়েটি যদি মা অথবা বন্ধুদের বলে দেয়, তাহলে তারা আমাকে খারাপ ভাববে। তা ছাড়া পরদিন মেয়েটির বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, সেটাতেও প্রভাব পড়তে পারে ভেবে বলিনি।

সকালবেলা লঞ্চ পটুয়াখালী এলে তারা চলে যায়, আমিও বাসায় আসি। বাসায় ফিরে সেদিন থেকে মনের ভেতরে সারাক্ষণ ছটফট করছে। আফসোস হচ্ছে, কেন আমি মেয়েটিকে ভালো লাগার কথাটা বললাম না। মেয়েটির সঙ্গে আর হয়তো জীবনে দেখা হবে না। আর হয়তো এমন হঠাৎ দেখার সুযোগ আসবে না। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরেফিরে এই একটা প্রশ্নই বারবার আসে। আমার অনেক মেয়ে ক্লাসমেট, বন্ধু আছে। আমার সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা হয়, অনেক নতুন মেয়ের সঙ্গেও দেখা–কথা হয়। কারও প্রতিই এমন ভালো লাগা কাজ করেনি।

ওই দিনের পর থেকে লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতেই পারছি না। আমার সামনে বেশ কটি চাকরির পরীক্ষা আছে। তবে মন বসছে না। এ অবস্থায় আমি কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। প্লিজ, আমাকে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করুন।

আসিফ, পটুয়াখালী

উত্তর: মনে হচ্ছে, যাত্রাপথে কিছুটা সময় একটি মেয়েকে দেখার পর থেকেই তোমার মধ্যে তীব্র আবেগ তৈরি হয়েছে। যদিও তার সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়নি বা তার সঙ্গে কোনো বাক্য বিনিময় হয়নি। এরপরও এই প্রথম একটি বিশেষ মানুষের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি তোমাকে বেশ কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তবে তোমার ভেতরে যে অনেকগুলো ইতিবাচক দিক রয়েছে, সেগুলো খুবই প্রশংসার দাবি রাখে। যেমন তুমি লিখেছ, মেয়েটির মা এবং তার দুই বন্ধুর মনে তোমার প্রতি বিরূপ মনোভাব যাতে তৈরি না হয়, সে ব্যাপারে তুমি অত্যন্ত সচেতন ছিলে। পরদিন যেহেতু তার ভর্তি পরীক্ষা রয়েছে, সে যেন তোমার প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরীক্ষায় খারাপ না করে, সেটিও তোমার বিবেচনায় ছিল। নিজের যুক্তিগুলো তুমি অত্যন্ত সঠিকভাবে ব্যবহার করে নিজেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছ। এটি প্রমাণ করে যে তুমি আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে নিজের মনটিকে সফলভাবে সামলে নিতে পারো। এতে আত্মসম্মান অক্ষুণ্ন রেখে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছ। এত অল্প বয়সে প্রচুর ধৈর্য ধারণ করার জন্য তুমি নিজেকে অবশ্যই বড় করে একটি ধন্যবাদ দিতে পারো।

আমার এই কথাগুলো অবশ্যই তোমার বর্তমান মানসিক পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারবে না। কারণ, তুমি নিজেকে সারাক্ষণ প্রশ্নবিদ্ধ করছ যে কেন তুমি আরও সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারলে না। আমাদের ভেতরে যেসব নেতিবাচক আবেগ, যেমন রাগ, দুঃখ, ভয়, হতাশা তৈরি হয়, সেগুলোর পেছনে নিজের চিন্তাধারার একটি ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। অবচেতন মনের প্রভাবে এখন যে চিন্তাগুলো তোমার আসছে, সেগুলোই বিভিন্ন আবেগ তৈরিতে অবদান রাখছে। তুমি যদি সেই মেয়েটির ব্যাপারে অনেকটা সময় নিয়ে ভাবতে থাকো, আর আফসোস করতে থাকো, তাহলে এই আবেগগুলো আরও তীব্র হতে থাকবে। আমার অনুরোধ, তুমি তোমার সচেতন মনটিকে ব্যবহার করে, অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করো।

কাউকে প্রথম দেখাতেই খুব ভালো লাগলে আমরা সম্পূর্ণ আবেগের বশে তাকে প্রস্তাব দিয়ে ফেলতেই পারি। তবে অপর পক্ষ তাতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটি আগে থেকে বুঝতে পারা কঠিন। যদি সেখান থেকে নেতিবাচক উত্তর আসে, তাহলে নিজেকে কীভাবে পরবর্তী সময়ে সামলাব, সেই প্রস্তুতিটি মনে রাখা খুব প্রয়োজন। আর তা ছাড়া কাউকে একেবারে না জেনে প্রথমেই প্রেমের প্রস্তাব দিলে পরবর্তী সময়ে সম্পর্কে টানাপোড়েন হলে আমরা নিজেকে দোষারোপ করতে থাকি। কাজেই প্রথমে দুজনের সম্মতিতে শুধু বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরির পরে পারস্পরিক ভালোবাসার সম্পর্কটিতে ঢুকলে ভালো হয়। যাত্রার সেই সময়টিতে তুমি এতটাই দ্বন্দ্বে ছিলে যে বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেওয়াটাও তোমার জন্য হয়তো কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেটি করতে পারলে মেয়েটির সঙ্গে পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ হতে পারত, যদি মেয়েটিও তাতে রাজি হতো। সেটি ঘটলে হয়তোবা তোমার এতটা মনঃপীড়ায় থাকতে হতো না। আশা করছি, এ কারণে তুমি নিজের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা হারাবে না এবং সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেবে।

লেখা পাঠাবেন যেভাবে

পাঠকের প্রশ্ন পাঠানো যাবে ই–মেইলে, ডাকে এবং প্র অধুনার ফেসবুক পেজের ইনবক্সে।

ই–মেইল ঠিকানা: [email protected] (সাবজেক্ট হিসেবে লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)

ডাক ঠিকানা: প্র অধুনা, প্রথম আলো, ১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫।

(খামের ওপর লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’) ফেসবুক পেজ: fb.com/Adhuna.PA