সুদানের সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনীর সংঘর্ষে অনেক সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন
ছবি: এএফপি

সুদানে চাকরির কথা প্রথম জানতে পারি বাড়ির পাশের একজনের কাছে। ৩০ বছর বয়সেই সংসারের হাল ধরতে পারব, ভেবে আমিও দ্রুত পাসপোর্ট করে ফেলি। কিন্তু সুদানে যেতে যে টাকা চাইল, সেটা আমার অভাবী পরিবারের পক্ষে জোগান দেওয়া সম্ভব না। তাই একটি সমিতির কাছ থেকে মাসে ১০ হাজার টাকা কিস্তিতে ২ লাখ ও স্বজনদের কাছ থেকে সুদে আরও ২ লাখ টাকা ঋণ করি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে রওনা হই। আমার সঙ্গে গ্রুপ ভিসায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও ৯ জন ছিল। আরব আমিরাতের দুবাই হয়ে পৌঁছাই সুদানের রাজধানী খার্তুমে।

বিমানবন্দরে নামার পর নিয়োগদাতা কোম্পানির লোকজন এসে আমাদের জাবরা এলাকায় নিয়ে গেলেন। কোম্পানিই সেখানকার একটি ভবনে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে।

কয়েক দিনের মধ্যেই কোম্পানির পক্ষ থেকে আমাদের ১০ জনকে একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়। অপারেটর পদে কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয় হেলপারের কাজ। বেতন মাসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। শুনে খুব হতাশ হলাম। কিন্তু গরিব ঘরের মানুষ, এত টাকা খরচ করে গেছি, ফিরে আসারও উপায় নেই।

২০২২ সালের অক্টোবরে অপারেটর পদে পদোন্নতি পাই। বেতন হয় ৩৫ হাজার টাকা। ভালোই চলছিল। বেতন বৃদ্ধিতে বাড়ির মানুষও খুশি। কিস্তি ও ঋণের টাকা শোধ করার জন্য হাতখরচ ছাড়া বেতনের পুরো টাকাই দেশে পাঠিয়ে দিতাম। আর কিছুদিনের মধ্যেই ঋণ শোধ হয়ে যাবে, পরিবারে সচ্ছলতা আসবে। কিন্তু কপালে আর সেটা সইল না।

সুদানে জহিরুল ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত

কষ্টের দিনগুলো

দিন পাঁচেক পর পবিত্র রমজানের ঈদ। দ্রুতই পরের কোনো ঈদে বাড়ি ফিরতে পারব। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে এসব ভাবছি। হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ। শুরুতে ভেবেছিলাম বজ্রপাত। বারান্দায় গিয়ে দেখি ধোঁয়া উড়ছে। একটু পরে শুনতে পাই হেলিকপ্টারের শব্দ। হেলিকপ্টার থেকে বোমা ফেলা হচ্ছে। দ্রুত রুমে ঢুকে চুপচাপ বসে পড়ি। কী হলো, কী হচ্ছে, আমাদের সবার চোখেমুখে এই প্রশ্ন। আমরা শ্রমিক মানুষ, দেশে কী হচ্ছে, সবকিছু তো জানিও না। সে রাত নির্ঘুম কেটে যায়।

সকাল সাতটার দিকে কাজে যাওয়ার জন্য বের হয়েছি। এক সুদানি শ্রমিকের সঙ্গে দেখা। তাঁকে রাতের কথা জিজ্ঞেস করতেই সতর্ক করে দিলেন, ‘অবস্থা খারাপ। বাইরে বের হয়ো না।’ পা আটকে গেল। রুমে ফিরে এলাম। কোম্পানির পক্ষ থেকেও কাজে যেতে নিষেধ করা হলো। শুধু তা–ই নয়, ঘরের বাইরে যেতেও নিষেধ করলেন তাঁরা।

ঘরে বসেই শুনতে পাচ্ছিলাম বুম বুম। বোমা বিস্ফোরণের শব্দ। কলিজাটা কেঁপে উঠছিল। জীবনে তো কখনো যুদ্ধ দেখিনি।

নিয়োগকারী কোম্পানি থেকে আমাদের খাওয়ার পানি সরবরাহ করা হতো। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে সাপ্লাইয়ের নোংরা পানি খেতে শুরু করি। এভাবে তিন দিন কেটে যায়। ইন্টারনেট বন্ধ, টানা তিন দিন বিদ্যুৎ নেই। ঘরের খাবারও ফুরিয়ে আসছে। বাইরেও যেতে পারি না। আর বাইরে গিয়েই–বা কী করব, দোকানপাটও যে বন্ধ। ঘরে যা আছে তা–ই রান্না করে একজনের খাবার তিনজনে খাই। ১০ জনে আলাপ করি, কী করা যায়? কোম্পানির অন্য দেশের শ্রমিকদের কাছে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি।

গোলার আঘাতে ভেঙে গেছে খার্তুম শহরের অনেক ভবন
ছবি: এএফপি

‘দেশে ফিরে আয়’

একদিন কোম্পানির একজন সুপারভাইজার আসেন। তিনি সবার পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে বলেন, ‘চাইলে তোমরা আমাদের সঙ্গে থাকতে পারো, দেশে ফিরেও যেতে পারো।’

এত কষ্ট করে ভাগ্য ফেরাতে সুদানে এসেছি, সবে একটু সুদিনের মুখ দেখতে শুরু করেছি, এর মধ্যে দেশে ফিরে যাব? আর দেশে ফিরে গেলে ঋণই–বা শোধ করব কীভাবে? আমরা সুদানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আশায় বুক বাঁধি, একটু–আধটু গোলমাল সব দেশেই হয়। কিছুদিনের মধ্যে সেটা ঠিকও হয়ে যায়।

কিন্তু সুদানের পরিস্থিতি আর ভালো হয় না। ক্রমে শুধু খারাপই হতে থাকে। দিন দিন আমাদের খাওয়ার কষ্টও বাড়ে। বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ নাগরিক মেরে ফেলার খবর পেতে থাকি। বিমানবন্দর গুঁড়িয়ে দেওয়ার খবর আসে। বোমার আঘাতে বিল্ডিং ধসে পড়ার খবর শুনি। জানালা খুলে তাকালে পথে পথে অস্ত্রধারীদের ঘুরতে দেখি। এসব শুনে ও দেখে আমরা ভয়ে জমে যাই। কেমন যেন মৃত্যুভয় চেপে বসে।

তখন দেশে ফেরার কথা ভাবি। কিন্তু দেশে চলে গেলে কি আর ফিরতে পারব? বাড়িতে ফোন করে মাকে পরিস্থিতি খুলে বলি। মা এককথায় বলেন, ‘দেশে ফিরে আয়, বেঁচে থাকলে পরে সংসারের হাল ধরতে পারবি।’

আহা, মায়ের মন!

খার্তুম থেকে জেদ্দা

১৫ বছর ধরে খার্তুমে আছেন মুক্তার চাচা। আমরা যে কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত, সেই প্রতিষ্ঠানের তিনি কর্মকর্তা। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনিই বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলেন। তিনি নিজেও যে দেশে ফেরার আবেদন করেছেন, সে কথাও জানালেন। মনে মনে ভাবি, এত টাকা বেতন পাওয়া একজন যখন চাকরি ফেলে দেশে ফিরে যাচ্ছেন, পরিস্থিতি তাহলে আসলেই খারাপ। আর একমুহূর্ত না দেরি করে তাঁর সহায়তায় দেশে ফেরার আবেদন করি।

ঈদের তিন দিন পর বাংলাদেশ দূতাবাস আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। খার্তুম শহরের একটি নির্ধারিত স্থানে আমাদের জড়ো হতে বলা হয়। কোম্পানিকে আমরা বিষয়টি জানাই। খুব ভোরে কোম্পানির একটি মিনিবাস আমাদের নিয়ে যাত্রা করে। যেতে যেতে দেখি, আশপাশের ভবন থেকে ধোঁয়া উড়ছে। গোলার আঘাতে ভেঙে গেছে অনেক ভবন। কয়েক জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্টে আমাদের গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বিদেশি শ্রমিক জেনে ছেড়ে দেয়।

নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখি, প্রায় ৭০০ বাংলাদেশি জড়ো হয়েছেন। সন্ধ্যার পর দূতাবাসের ব্যবস্থায় গাড়িতে শুরু হয় যাত্রা। রাতভর চলে গাড়ি। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ভোরের দিকে পোর্ট সুদানে পৌঁছাই। প্রাইমারি স্কুলের মতো একটি ভবনে আমাদের সবাইকে রাখা হয়। সেখানকার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রচণ্ড গরমে খুব কষ্ট হচ্ছিল। পানিও লবণাক্ত, খেতে পারছিলাম না। পেটে তীব্র ক্ষুধা। তবু দেশে ফিরতে পারব ভেবে একধরনের স্বস্তি লাগছিল।

নৌপথে আমাদের সৌদি আরবের জেদ্দায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। পরে সেই সিদ্ধান্ত বদল হয়। জানানো হয়, কার্গো বিমানে করে সৌদি আরবে পাঠানো হবে। এভাবে খেয়ে না–খেয়ে তিন দিন কেটে যায়। তারপর সিদ্ধান্ত হয়, প্রথম দফায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরাসহ ১৩৬
জনকে  পাঠানো হবে। আমার হার্টের অসুখ। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রও আছে। সেই সুবাদে প্রথম দফায় ফেরার সুযোগ পেয়ে যাই।

নিজের বাড়িতে জহিরুল
ছবি: ছুটির দিনে

 ‘বেঁচে ফিরছ, এতেই আমি খুশি’

পোর্ট সুদানের সেই আশ্রয় থেকে মিনিবাসে করে আমাদের বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। এরপর কার্গো বিমানে তুলে সৌদি আরবের জেদ্দায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশি পাহারায় সবাই সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসে যাই। দূতাবাসে মুরগির মাংস আর ডাল দিয়ে ভাত খেতে দেওয়া হয়। খেতে খেতে কান্না চলে আসছিল। মনে হচ্ছিল, এত ভালো খাবার কত দিন পর খেলাম!

এক ঘণ্টা পর দূতাবাস থেকে আবার একটি মিনিবাসে তোলা হয়। সেই গাড়ি ছুটে যায় জেদ্দা বিমানবন্দর অভিমুখে। সেখানে বোর্ডিং শেষে আমাদের বাংলাদেশ বিমানে তুলে দেওয়া হয়। ৮ মে সকালে দেশের মাটিতে আমরা পা রাখি।

বিমানবন্দরেই আমাদের প্রত্যেকের হাতে পাঁচ হাজার টাকার খাম তুলে দেওয়া হয়। সেই টাকায় বিকেলে বাড়িতে পৌঁছাই। মা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলছিলেন, ‘বেঁচে ফিরছ বাবা, এতেই আমি খুশি।’

সত্যিই তো, যে অবস্থা দেখেছি, ভাবতে পারিনি বেঁচে ফিরতে পারব।