এরই মধ্যে দুজন নারী-পুরুষ এগিয়ে এলেন। এই দুজন চঞ্চল চৌধুরীর বয়স্ক মা-বাবার দেখভাল করেন। আমাদের কণ্ঠ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন চতুর্থজনও। তিনি চঞ্চল চৌধুরীর বাবা রাধাগোবিন্দ চৌধুরী। বর্তমান বয়স ৯১ বছর।

রাধাগোবিন্দ চৌধুরীর শারীরিক অবস্থা দেখে বুঝতে বাকি রইল না, প্রথম আলোর কর্মী উৎসবে বাবার কথা বলতে গিয়ে চঞ্চল চৌধুরীর কণ্ঠ কেন ভারী হয়ে উঠেছিল। বয়সের ভারে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন এলাকার জনপ্রিয় এই শিক্ষক। তবে ফেলে আসা দিনের কথা বলতে এতটুকু ক্লান্তি নেই। উঠানে বসে গল্প শুরু করেন। পাশে বসেন নমিতা রানী। চঞ্চল চৌধুরীর শৈশব-কৈশোর আর বেড়ে ওঠার নানা গল্প শোনান দুজন।

চঞ্চল চৌধুরীরা তিন ভাই ও পাঁচ বোন। কেউই তাঁরা বাড়িতে থাকেন না। চঞ্চলের মেজ ভাই অরিত্র চৌধুরী চিকিৎসক। চঞ্চল চৌধুরীর মতো তিনিও থাকেন ঢাকায়। চঞ্চল চৌধুরীর মা–বাবার শহর একদম ভালো লাগে না। দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই বেশি দিন ছেলেদের বাড়িতে থাকতে পারেন না। গত সপ্তাহে দুই ছেলের বাড়ি ঘুরে গ্রামে এসেছেন দুজন। নমিতা রানী বলেন, ‘এখানে একটু হেঁটে বেড়ানো যায়। অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। কথা বলা যায়।’ সব মিলিয়ে গ্রামেই ভালো থাকেন তাঁরা।

দেয়ালের গল্প

কথা বলতে বলতেই একতলা দালানের দেয়ালটায় দৃষ্টি আটকে যায়। যেখানে কালো টেপ দিয়ে আটকানো প্রথম আলোর একসময়ের ক্রোড়পত্র ‘আনন্দ’-তে ছাপা হওয়া চঞ্চল চৌধুরীর সাক্ষাৎকার। আছে অন্য পত্রিকারও কাটিং। কাটিংগুলো দেখেই বোঝা গেল বেশ পুরোনো। কিছু কাগজ দেয়াল থেকে খসে নিচে পড়ে আছে। এক দিকের টেপ খুলে ঝুলে আছে কয়েকটা।

প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে চঞ্চল চৌধুরীর মুখে এই দেয়ালের গল্পই শুনেছি। তিনি বলেছিলেন, একসময় তাঁদের গ্রামে পত্রিকা যেত না। যখন নাজিরগঞ্জ বাজারে পত্রিকা যাওয়া শুরু হলো, চঞ্চল তাঁর বাবার কাছে পত্রিকা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। তাঁর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবা গভীর মনোযোগে পুরো পত্রিকা পড়তেন। আর ছেলের খবর প্রকাশিত হলে, সেই অংশটুকু নিয়ে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। স্কচটেপ দিয়ে বাড়ির দেয়ালে লাগিয়ে রাখতেন কাটিং। এখনো তিনি পত্রিকা পড়েন, কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত ছেলের খবরের অংশটুকু আর স্কচটেপ দিয়ে দেয়ালে লাগানোর শক্তি শরীরে নেই। সাঁটানো পেপার কাটিংগুলোও দেয়াল থেকে খসে পড়ছে, সেগুলো আর সাঁটিয়ে দিতে পারেন না।

কথাগুলো বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন চঞ্চল। ভার হয়ে আসে কথা। সেই সূত্র ধরেই হাজির হয়েছি চঞ্চলের বাড়িতে। স্মৃতিময় সেই দেয়ালের দিকে এগিয়ে যাই। সঙ্গে আসেন রাধাগোবিন্দ চৌধুরী। দেয়ালের কাছে এসে ঝুলে থাকা একটি পেপার কাটিং আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বয়স তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করে। তিনি সেই পেপার কাটিংয়ের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে যান, ‘সন্তানের সাফল্য প্রত্যেক বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সেই প্রাপ্তিটুকু পেয়েছি। এখন ওরা ভালো থাকলেই আমরা ভালো থাকি।’

রাধাগোবিন্দও অভিনয় করেছেন

অতিথি আগমনের খবরে চঞ্চল চৌধুরীর বড় বোন পলি পোদ্দার এলেন। পাশেই তাঁর বাড়ি। মা-বাবার তদারক তিনিই বেশি করতে পারেন। আমাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে ঘরের ভেতরে চলে যান। রাধাগোবিন্দ চৌধুরীর সঙ্গে আমাদের আলাপ চলতেই থাকে। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিয়েছেন যেন তিনি। একসময় অভিনয় করতেন। কলেজের নাট্যদলে ছিলেন। গ্রামে যাত্রাপালায় কাজ করেছেন। সেসব গল্প বলেন। আর বললেন, ছেলে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়শিল্পী হয়ে ওঠা তাঁকে আনন্দ দেয়।

কথায় কথায় বেলা বাড়ল। এর মধ্যে আপ্যায়নের পালাও শেষ। বিদায় নিতে হলো। তবে চোখের কোণে আটকে থাকল ছেলের সাফল্যের খবরে মোড়ানো এক বাবার স্মৃতির দেয়ালটি।