স্যাঁতসেঁতে বর্ষায় যেভাবে সতেজ রাখবেন ঘরের অন্দর

বর্ষা মৌসুমে প্রকৃতি সজল–সজীব হয়ে উঠলে কী হবে, অন্দর হয়ে ওঠে স্যাঁতসেঁতে। জিনিসপত্র থেকে সোঁদা গন্ধও পাওয়া যায়। তবে একটু যত্ন করলেই বর্ষায়ও অন্দর রাখা যায় সতেজ। এটা নিয়েই সৃষ্টি আর্কিটেকচার অ্যান্ড কনসালট্যান্সির প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি তাসনিম তূর্যি এবং ঢাকার গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্টারপ্রেনিউরশিপ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহানা শরীফ-এর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম।

আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্দরে পর্যাপ্ত হাওয়া আর রোদের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। মডেল: নুসরাত, স্থান কৃতজ্ঞতা: শেখ সিরাজুম মুনিরা
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

বর্ষায় বাতাস হয়ে ওঠে আর্দ্র, অর্থাৎ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যায়। বাড়ির অন্দরে এই জলীয় বাষ্প জমার সুযোগ পেলেই মুশকিল। তখনই অতিরিক্ত আর্দ্র হয়ে ওঠে অন্দরের পরিবেশ। এমন আর্দ্র অন্দরে সহজেই ছত্রাকের আক্রমণ হয়। পোকামাকড়ের উপদ্রবও বাড়ে। ঘরের দেয়াল ও মেঝে হয় স্যাঁতসেঁতে। ঘরের গন্ধটাও খুব একটা সুখকর হয় না।

অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে নষ্ট হতে পারে কাঠের জিনিসের আকৃতি। কাপড়ে তিলা পড়তে পারে। সব মিলিয়ে সতেজতা হারায় অন্দর। আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এসব সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বর্ষাকালে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে নষ্ট হতে পারে কাঠের জিনিসের আকৃতি। মডেল: নুসরাত, স্থান কৃতজ্ঞতা: শেখ সিরাজুম মুনিরা
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

চাই হাওয়া, চাই রোদ

আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্দরে পর্যাপ্ত হাওয়া আর রোদের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। তবে এ কথাও ঠিক, শহুরে অন্দরে রোদ ঢোকার সুযোগ কম। তবে রোদ আসুক আর না আসুক, সময়–সুযোগ বুঝে রোজই জানালা-দরজা খুলে আলো-বাতাস আসার সুযোগ দিন। এক পাশের জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকে বিপরীত দিকে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ থাকলে খুবই ভালো। শুধু জানালা-দরজা খোলার সময় বৃষ্টি না থাকলেই হলো।

দিনে পর্দা সরিয়ে রাখুন। প্রয়োজনে পাতলা পর্দা কাজে লাগাতে পারেন, যা ভেদ করে আলো-বাতাস প্রবেশ করে। আর বৃষ্টিতে ভিজে গেলেও সহজেই শুকিয়ে যায়। রান্নাঘর ও ওয়াশরুমে এগজস্ট ফ্যানের ব্যবস্থা রাখুন। সম্ভব হলে কিচেন চিমনি লাগিয়ে নিন। তবে অবশ্যই সঠিক নিয়মে ব্যবহার করতে হবে। তাহলে রান্নার কারণে ঘর গুমোট হবে না।ভেন্টিলেটর থাকলে বাতাস চলাচল ভালো হয়। যদিও এখন এর তেমন চল নেই। প্রয়োজনে ঘরেও এগজস্ট ফ্যান লাগানো যায়, যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

ঘর নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। মডেল: নুসরাত, স্থান কৃতজ্ঞতা: শেখ সিরাজুম মুনিরা
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

দেয়ালের ক্ষতি হলে

দেয়াল বা ছাদ যদি ভিজে ওঠে, এগুলো থেকে কিছু খসে পড়ে বা ছত্রাকের মতো কোনো আবরণ (সাদা বা কালো) সৃষ্টি হয়, তাহলে পেশাদার ব্যক্তির সহায়তা নিন। দেয়ালের প্লাস্টার ভেঙে, নতুন প্লাস্টার করিয়ে, ড্যাম্প প্রুফ পেইন্ট করিয়ে নিন। বাড়ির দেয়ালের বাইরের অংশেও অ্যান্টিফাঙ্গাল (ছত্রাকরোধী) পেইন্ট করিয়ে নেওয়া ভালো। ছাদে কোথাও পানি জমলে সেটিও সারিয়ে নিন। ভবনের পানি নিষ্কাশন পাইপ, ওপরের তলার দেয়াল বা ছাদের কোনো সমস্যার কারণেও আপনার ঘরের দেয়াল ভিজে উঠতে পারে।

তাই প্রথমে পেশাদার ব্যক্তিকে দেখিয়ে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করুন। বিশেষভাবে খেয়াল রাখুন ঘরের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বা সুইচবোর্ডের কাছে দেয়ালে কোথাও ভেজা ভাব দেখা যাচ্ছে কি না। নইলে ঘটতে পারে বড়সড় দুর্ঘটনা। এ কারণে রোজ অন্তত একবার শিশুর ঘর এবং বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির ঘরের সবকিছু ঠিক আছে কি না, দেখে নেওয়া উচিত।

এই যাহ! দরজা

বাতাসের আর্দ্রতার প্রভাব পড়ে কাঠের তৈরি দরজা এবং আসবাবে। জলীয় বাষ্প শোষণ করে কাঠ ফুলে যায়। তাই দরজা ফ্রেমের চেয়ে বড় হয়ে যায়। দরজা খুলতে এবং লাগাতে অসুবিধা হয়। দরজার কবজাও শক্ত হয়ে যেতে পারে। কাঠের আসবাবও এঁকেবেঁকে যায়। এগুলো ব্যবহার করতে বেশ অসুবিধা হয়।

শক্ত কবজায় তেল দিলে সমস্যার সমাধান হতে পারে। তবে দরজা বা আসবাবের কাঠের আকার-আকৃতি বদলে গেলে পেশাদার ব্যক্তির সহায়তা নেওয়াই ভালো। পলিশিং বা ফিলার প্রয়োজন হতে পারে। পানিরোধী রং করিয়েও নিতে পারেন।

গুমোট ভাব কাটাতে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি সুগন্ধি মোম ব্যবহার করতে পারেন
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

আসবাবে আরও যা

আসবাব রাখুন দেয়াল থেকে অন্তত দুই-আড়াই ইঞ্চি দূরে। এমনভাবে ঘর সাজান, যেন জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট এলেও আসবাব না ভেজে। আসবাব রোজ মুছে ফেলুন শুকনা কাপড় দিয়ে। প্রয়োজন না হলেও সপ্তাহে একবার কিছু সময়ের জন্য আসবাবের দরজা বা ড্রয়ার খুলে রাখা উচিত।

যে আসবাবে কাপড়চোপড় বা বইপত্র রাখা হয়, সেগুলোর ভেতর শুকনা নিমপাতা দিয়ে রাখা যেতে পারে। সিলিকা জেলের প্যাকেট কিংবা কর্পূরও রাখা যায়। ন্যাফথালিন ব্যবহারে রাসায়নিকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। কোনো কিছু রাখার আগে আসবাবে বড় ট্রেসিং পেপার বিছিয়ে নিতে পারেন। বিশেষ করে কাঠের আসবাবে সাধারণ কাগজ বা পলিথিনের পরিবর্তে ট্রেসিং পেপার বিছানো ভালো।

আরও যা

  • দরজায় ফোমজাতীয় অনুষঙ্গ ব্যবহার করলে পানি ঢোকে না। তা ছাড়া জানালা বা বারান্দার দরজার ফ্রেমও পরীক্ষা করানো উচিত, যাতে পানি ঢোকার সুযোগ না থাকে।

  • ঘর মোছার পর দ্রুত শুকিয়ে নিন।

  • বালিশ বা কুশনজাতীয় জিনিস মাঝেমধ্যে রোদে দিন।

  • প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি সুগন্ধি মোম ব্যবহার করতে পারেন। গুমোট ভাব কেটে যাবে। কিংবা সুগন্ধি ফুলও রাখতে পারেন ঘরে।

  • সম্ভব হলে ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন। ৪০–৬০ শতাংশ আর্দ্রতা বজায় রাখতে পারলে ভালো।

  • গাছে অতিরিক্ত পানি দেবেন না। মেঝে বা টবের নিচের প্লেটে পানি থাকতে দেবেন না।

  • বারান্দা, ছাদ এবং বাড়ির আশপাশটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। বাড়ির পাশে ময়লা ভিজে পরিবেশের আর্দ্রতা আরও বাড়তে পারে। তাতে দেয়াল আর্দ্র হয়ে যায়। আর আবর্জনার মধ্যে পানি জমে থাকলে মশার ভয় তো থাকেই।