তিন কাঠা জায়গায় যখন বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা করেন, তখন থেকেই বিশ্বজিতের মাথায় নানান চিন্তা খেলা করতে থাকে। দাদার কথা মনে পড়ে। দাদা বলতেন, ‘মানুষের খাওয়া কেউ দেখে না। তাই খাইতে পারিস আর না পারিস, বাসাটা এভাবে তৈরি করবি যে তোকে প্রতিদিন আকর্ষণ করবে, ফিরে আসতে বাধ্য করবে।’ দাদার এই কথা আমার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। নিজের বাড়িটা যদি কুঁড়েঘরও হয়, তারপরও প্রত্যেকে সেটাকে পরিপাটি রাখে। এসব ভেবে ঠিক করেছেন, নিজের বাড়ি নিজের পছন্দেই করবেন। স্থপতির সঙ্গে আলাপ করে ফেয়ার ফেসে বাড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত নেন বিশ্বজিৎ, ‘আমাদের সংসদ ভবন, সিডনির অপেরা হাউস কিন্তু ফেয়ার ফেস প্লাস্টারে হয়েছে। এর সুবিধা হচ্ছে, স্থায়িত্ব বেশি, গরম লাগে কম আর রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কম। কনভেনশনাল ভবন না করে একটু ভিন্নভাবে করা আরকি। এ ধরনের ভবনের নির্মাণ ব্যয়বহুল হলেও স্থায়িত্ব অনেক বেশি। সবচেয়ে বড় বিষয় রং করা লাগে না, দেয়াল পরিষ্কারের ঝামেলাও নেই।’

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বড় একটা ঝাড়বাতিতে চোখ পড়ে। পাশেই বাঁ দেয়ালে একটি ছিদ্র। কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘শেষ বিকেলের আলো ওই ছিদ্র দিয়ে যখন ঝাড়বাতির ওপর এসে পড়ে, তখনকার সৌন্দর্য অন্য রকম।’ কথায়–কথায় জানালেন, এই বাড়িতে ছোট–বড় মিলিয়ে ৪০০ বাতি আছে। এর মধ্যে স্পটলাইটই বেশি।

চারতলা বাড়ির নিচতলায় কুমার বিশ্বজিতের মায়ের শোবার ঘর। মায়ের মৃত্যুর পর ঘরটা এখন খালি পড়ে থাকে। এই তলায় অতিথিদের একটা বসার ঘরও আছে। দোতলায় ড্রয়িং, ডাইনিং ও ফর‌মাল কিচেন। তিনতলায় দুটি বেডরুম। একটিতে কুমার বিশ্বজিৎ আর তাঁর স্ত্রী থাকেন, অন্যটিতে তাঁর সন্তান। যদিও পড়াশোনা করতে ছেলে এখন কানাডায় আছেন। চারতলায় স্টুডিও, লাইব্রেরি, অতিথিদের থাকার ঘর, রান্নাঘর আর বিলিয়ার্ড কক্ষ। আর চারতলার ছাদের অনেকটা জুড়ে দ্বিতল ছাদবাগান। আর এক কোণে থিয়েটার রুম।

‘একসময় বয়স বাড়বে। সবকিছুর ক্ষমতা কমবে। আমাকে ঘরেই থাকতে হবে। তাই বাড়িটাকে আমার মতো করে সাজিয়ে নিয়েছি, যেন একা বোধ না করি। ঘরে বসে গান বানাব, তাই স্টুডিও করেছি। ফুল দেখব, ফল দেখব, তাই দ্বিতল বাগান গড়েছি। বই পড়ে সময় কাটাব, তাই লাইব্রেরি করেছি। মন চাইলে সিনেমা দেখব, তাই একটা থিয়েটার রুমও করেছি। বিলিয়ার্ড খেলার একটা ঘর আছে। এসব করে দিন পার হবে। এ জন্যই বাড়ি ঘিরে এত সব আয়োজন,’ বলছিলেন শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ।

 কুমার বিশ্বজিতের বাড়ির নকশা করেছিলেন স্থপতি নাঈম আহমেদ। নকশায় কিছু খামতি ছিল, পরে যা অন্দরসজ্জার মুনশিয়ানা দিয়ে কাটিয়ে ওঠা গেছে। কুমার বিশ্বজিৎ জানালেন, তিন কাঠার এই বাড়ির সবচেয়ে বড় অসুবিধা বাড়িটি উত্তরমুখী। ভেতরে বাতাস আনাটা ছিল কঠিন। পেছনের প্লটের দুটি ভবনের ফাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস আমাদের বাড়িতে আনার জন্য উত্তর পাশের দেয়ালটা একটু বাঁকা করে দিয়েছি। বাড়িতে আলো প্রবেশের ব্যাপারটাও নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি এক রুমের সঙ্গে আরেকটার সংযোগ নিয়েও ভাবতে হয়েছে। আমি তিনতলায় থাকলেও নিচতলায় থাকা আমার মায়ের রুমটা দেখতে পেতাম। আমার রুম থেকে ছেলের রুমও দেখা যায়। তবে প্রাইভেসিও আছে। রুমে লাইট কতক্ষণ জ্বলছে, হাঁটছে কি না—এসব পর্যবেক্ষণ করা যায় আরকি। বাইরে থেকে ছোট্ট প্লট মনে হলেও ভেতরটা দারুণভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

দ্বিতল ছাদবাগানে ওঠার আগে এক কোনায় বড় একটি কক্ষ। সেখানে ঢুকতেই দেখা গেল একটি প্রজেক্টর। এখানে বসে সিনেমা দেখেন কুমার বিশ্বজিৎ। ঘরের ছাদটা স্বচ্ছ, আকাশ দেখা যায়। দিনের আলো পুরো ঘরকে আলোকিত করে। বৃষ্টি শুরু হলেই এই ঘরে চলে আসেন বিশ্বজিৎ। মাথার ওপরের স্বচ্ছ ছাদে বৃষ্টির পানি পড়ছে আর এদিকে চলছে প্রিয় কোনো চলচ্চিত্র।

বাবা, দাদার কাছ থেকে বংশপরম্পরায় পেয়েছেন প্রকৃতিপ্রেম। বাসার ছাদ থেকে শুরু করে বারান্দা—সর্বত্র নানা প্রজাতির ফুল ও ফলের গাছ। দ্বিতল ছাদবাগানজুড়ে নানা ধরনের ফল আর ফুলগাছ। এখন সেখানে রয়েছে জলপাই, আম, মালবেরি, আঙুর, ডালিম, পেঁপে, আপেল, বরই, লেবু, পেয়ারার মতো অনেক ফল। ছাদের সামনের অংশের পুরোটায় কাঠগোলাপগাছ। এ ছাড়া রয়েছে বাগানবিলাসের বাহার।

এক দশক আগে বাড়িটি বানিয়েছেন কুমার বিশ্বজিৎ। প্রথমে লাগিয়েছেন নিমগাছ। বাড়ির গাছের সব ফল তোলা হয় না, কিছু রেখে দেওয়া হয় পাখিদের জন্য। তারা নিয়মিত ছাদে আসে, গাছে গাছে ঘুরে বেড়ায়। ছাদের পানির ট্যাংক সাদা সিমেন্ট দিয়ে এমনভাবে তৈরি করেছেন, দেখলে মনে হয় বড় কোনো পাথর। ছাদে দুটি বিম ছিল, সেটাকে একটা সেতুতে রূপ দিয়েছেন, দেখে আর বোঝার উপায় নেই।

পুরো বাড়ি ঘুরে জানতে চাইলাম, বাড়ি আপনার কাছে কী? কুমার বিশ্বজিৎ বললেন, ‘সারা দিন কাজ শেষে একটা জায়গায় ফিরতে চায় মানুষ, সেটা হচ্ছে বাসা। তাই সামর্থ্য ও পছন্দ অনুযায়ী সবাই বাড়ি করে। যার যার বাসা তার কাছে শ্রেষ্ঠ শান্তির জায়গা। সারা দিনের ক্লান্তি, অবসাদ শেষে সবাই ফিরে আসে কিন্তু সংসারে। সংসারের আশ্রয়স্থল হচ্ছে বাসা।’