অন্দরসজ্জায় আন্তর্জাতিক পুরস্কার আনল যে অফিস
প্রায় সব চাকরিজীবীর ক্ষেত্রেই এই কথা সত্যি—ঘরের চেয়ে বেশি সময় কাটে অফিসে। দিনের পর দিন যেখানে বসে অফিস করতে হয়, সেই জায়গার অন্দরসজ্জা তো ভালো হওয়া চাই। ঢাকায় আজকাল এমন অফিস তৈরি হচ্ছে, যেখানে অন্দরসজ্জায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কাজের পরিবেশ উন্নত করতে। এমনই একটি অফিসের গল্প আজ শোনাব, যে অফিসের অন্দরসজ্জায় এসেছে আন্তর্জাতিক পুরস্কার। স্থপতি শরীফ উদ্দিন আহমেদ–এর সঙ্গে অফিসটি ঘুরে এসে লিখেছেন জিনাত শারমিন
রাজধানীর একজন চাকরিজীবীর কথা কল্পনা করুন। সকাল ৯টায় তড়িঘড়ি করে বাসা থেকে বের হওয়া। যানজট ঠেলে ১০টার ভেতর অফিসে পৌঁছে লিফট থেকে দৌড়ে বায়োমেট্রিক অ্যাটেনডেন্স পাঞ্চিং মেশিনে হাতের আঙুল রাখা। পরবর্তী ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কেটে যায় সেখানেই।
কেউ কেউ তো ঘরে ফেরেন কেবল ‘চার্জড’ হতে। বাসায় ঢুকেই ফ্রেশ হয়ে নাকে-মুখে কটা ভাত খেয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়েই ঘুম! পরদিন উঠে একই রুটিনের পুনরাবৃত্তি। তাই অফিস জায়গাটা কর্মিবান্ধব হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সজীব, উজ্জ্বল এক পরিবেশে দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা যেকোনো চাকরিজীবীর জন্যই একটা স্বপ্ন। আর এমন ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টাই বাংলাদেশের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘স্থাপতিক’কে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
একটা অফিস শুধুই উৎপাদনের স্থান নয়। এটি মানসিক স্বাস্থ্যের, সম্পর্কের আর আনন্দেরও ক্ষেত্র বটে। এ ভাবনা থেকেই স্থাপতিক তৈরি করেছে এক ‘মানবিক অফিস’, যেখানে কর্মজীবনের নানা দিকের সমন্বয় ঘটেছে।
গুলশান–তেজগাঁও লিংক রোড–সংলগ্ন ১২৬৯ বর্গমিটারের একটি করপোরেট অফিস, যেটি মূলত একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি শুরু হওয়া এই অন্দরসজ্জা প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয় স্থপতি শরীফ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কোনো স্পেস ডিজাইন করি, তখন ভাবি—এই জায়গা আগামী বছরগুলোয় মানুষ কীভাবে ব্যবহার করবে। সে সময় সে কেমন অনুভব করবে। তাই শুধু ফাংশনালিটিই নয়, মানসিক প্রশান্তি আর মানবিক সংযোগও নকশার অংশ।’
ভাবনা ও দর্শন
যে করপোরেট প্রতিষ্ঠানটির জন্য এই নকশা করা, সেই ব্র্যান্ডের ট্যাগলাইন হলো ‘সুখ, সংযোগ আর উদ্যাপন’। সেই অদৃশ্য অনুভূতিকে স্থাপত্যের ভাষায় প্রকাশ করাই ছিল নকশার মূল চ্যালেঞ্জ। অফিসের প্রতিটি অংশ তাই এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যেন সেটি আনন্দের শক্তিকে ধারণ করে। যেন আলো, বাতাস, হাসি আর আনন্দ একসঙ্গে মিশে যায় দৈনন্দিন কর্মজীবনে।
নকশার ধারণা
প্রাকৃতিক আলোকে ‘ডিজাইন ম্যাটেরিয়াল’ হিসেবেই ব্যবহার করা হয়েছে। উত্তর–দক্ষিণে বড় বড় কাচের পার্টিশন দেওয়া হয়েছে। আলোর সঙ্গে দৃষ্টিও যাতে করপোরেট সীমানা পেরিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে, এভাবেই তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য সংযোগ। স্থপতির ভাষায়, ‘যেভাবে ঈদের চাঁদ দেখলে হঠাৎ আনন্দের এক মিলন অনুভূত হয়, তেমনি এই অফিসে আমরা চেয়েছি প্রতিদিনের কাজের মধ্যেও যেন সেই সম্মিলিত আনন্দের শক্তি অনুভব করা যায়। কর্মীরা যেন ইতিবাচকভাবে কাজের প্রতি অনুপ্রাণিত হন।’
আন্দোলিত স্থাপত্য: প্রবাহের স্থির রূপ
এই অফিসের স্থাপত্যে নেই কোনো কঠোর জ্যামিতি। বরং এখানে চলন, বাঁক আর প্রবাহই অন্দরনকশার ভাষা। এটি একটি পানীয় কোম্পানির অফিস। তাই সিলিংয়ে রয়েছে তরঙ্গিত বাঁক, যা দেখে মনে হয় যেন তরলের গতি। আলো সেই বাঁকের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে এক নরম উজ্জ্বলতায়।
কাজের এলাকা গুচ্ছাকারে সাজানো হয়েছে হানিকম্ব প্যাটার্নে। বিশেষ এই নকশা একদিকে ব্যক্তিগত কাজের স্বাধীনতা দেয়, অন্যদিকে যোগাযোগকেও সহজ করে। এই মিশ্র ভারসাম্যই তৈরি করে ‘কমিউনিটি উইদিন ইনডিভিজ্যুয়ালিটি’, অর্থাৎ সংযুক্ত থেকেও নিজস্বতার ধারণা। অফিসের প্রতিটি অংশের নকশায় প্রবাহের এই ভাব যেন স্থাপত্যের ভাষায় অনূদিত হয়েছে। দেয়ালের কাচ, সিলিংয়ের বাঁক কিংবা সার্কুলেশনের গতি—সবই এক সুরে বাঁধা।
কো-ওয়ার্কিং স্পেস
আজকের কর্মসংস্কৃতিতে কো-ওয়ার্কিং স্পেস যেন সহযোগিতা ও উন্মুক্ততার নতুন ভাষা। এখানে একই অফিসে একাধিক বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট দল একসঙ্গে কাজ করে, কিন্তু প্রত্যেকে নিজের স্বাধীনতাও বজায় রাখে।
স্পেসের বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে সহজেই কথা হয় কিংবা চেয়ার ঘুরিয়ে পাশের সহকর্মীর সঙ্গে পরামর্শ করা যায়। তার পাশেই থাকে উন্মুক্ত কোনো অনানুষ্ঠানিক মিটিংয়ের জায়গা। এতে কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ে। সময়ে আমির পরিবর্তে আমরা হয়ে ওঠার যে ডিজাইন ধারণা, সেটাই কো-ওয়ার্কিং স্পেস। এই ভাবনা দারুণভাবে মাথায় রাখা হয়েছে অফিসের অন্দরে।
পারসোনেল স্পেস
প্রত্যেক কর্মী যেন নিজের একটা ক্ষুদ্র জগৎ তৈরি করতে পারেন—এ ভাবনা থেকেই এসেছে পারসোনেল স্পেস ধারণা। এখানে প্রত্যেকে নিজের কাজের জায়গাকে নিজের মতো করে সাজাতে পারেন। এমন একটি জায়গা মানুষকে মানসিকভাবে নিরাপদ ও সংযুক্ত রাখে—অফিসকে তখন আর শুধু কর্মস্থল নয়; বরং ‘নিজের’ একটা পরিসর মনে হয়।
ক্যাজুয়াল স্পেস
দিনভর কাজের মধ্যে একটু হালকা সময়ের প্রয়োজন সবারই হয়। সেই প্রয়োজন থেকেই এসেছে ক্যাজুয়াল স্পেস—একটি আরামদায়ক, নিরাবেগ অঞ্চল, যেখানে কর্মীরা নিঃশব্দে নিজের মতো করে সময় কাটাতে পারেন। এখানে রয়েছে ইনফরমাল সিটিং, বিন ব্যাগ, হালকা আলো, কিছু বই বা ম্যাগাজিন আর জানালার ধারে সবুজের ছোঁয়া। এই জায়গায় কেউ চাইলে কফি হাতে হেলান দিয়ে বসে সহকর্মীর সঙ্গে গল্প করতে পারেন, কেউ আবার নিজের চিন্তাগুলো গুছিয়ে নিতে পারেন। কাজের চাপের মধ্যে এই ক্যাজুয়াল স্পেস যেন ছোট্ট একটা ‘নিশ্বাস ফেলার জায়গা’, যেখানে ক্লান্তি মিলিয়ে যায়। আর মন আবার শক্তি জোগায় নতুন করে কাজে ফেরার জন্য।
ফোকাসড স্পেস
ফোকাসড স্পেস মূলত এমন একটি নিরিবিলি অঞ্চল, যেখানে বাইরের আওয়াজ ঢোকে না কিংবা ভেতরের শব্দ বাইরে যায় না। এখানে কর্মীরা গভীর মনোযোগে কাজ করতে পারেন অথবা ফোনে কথা বলা বা ছোট মিটিংয়ের মতো সংক্ষিপ্ত কাজও সেরে নিতে পারেন। এ ধরনের হাই পার্টিশন সাউন্ডপ্রুফ পরিবেশ মনোযোগ ধরে রাখে, বিশেষত যেসব কাজ একান্ত মনঃসংযোগ দাবি রাখে।
টাউন হল স্পেস
একটি প্রাণবন্ত অফিসের হৃদয় হলো টাউন হল স্পেস। এটি এমন এক বহুমুখী এলাকা, যা কখনো হয়ে ওঠে বড় সভার জায়গা, কখনো গেট টুগেদার বা জন্মদিনের আসর। প্রয়োজনে এখানেই হয় ঘোষণা, প্রশিক্ষণ বা দলীয় আলোচনা। এটা একটা মাল্টিপারপাস স্পেস, যেখানে কর্মীরা টিটি বা ফুসবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলা করতে পারে। এতে মন ভালো থাকে, কাজে গতি আসে। এই স্পেসের সঙ্গেই সংযুক্ত রয়েছে একটি ক্যাফে, যেখানে আনুষ্ঠানিকতা হারিয়ে সবাই মিশে যায় কথোপকথনে, হাসিতে আর মানবিক উষ্ণতায়।
উপকরণের ব্যবহার
বিভিন্ন সময় অন্দরসজ্জায় কী উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ব্যবহার করা উপকরণ দাহ্য কি না, পরিবেশবান্ধব কি না, এটা বোঝা বা নির্ধারণ করা একজন স্থপতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। ঠিক একই সঙ্গে কাস্টমাইজড আসবাবের মাপজোখ, উচ্চতা, চেয়ার বা সোফার ফ্লেক্সিবিলিটি, আরাম, আলোর মাত্রা নির্ধারণ ও নয়েজ রিডাকশন নির্ধারণ করাও জরুরি। কেননা এই সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। এই অফিস অন্দরনকশা করতে এসব ভাবনা মেনে চলা হয়েছে।
রং ও উপকরণের ভাষা
রং এখানে কেবল সাজসজ্জা নয়, একধরনের মানসিক বার্তা দিয়ে যায়। ব্র্যান্ডের প্রতীকী উজ্জ্বল লাল রংটি অন্দরসজ্জায় আনন্দ ও শক্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেটার ভারসাম্য রাখতে ব্যবহৃত হয়েছে সবুজ, ধূসর ও কালো, যা চোখকে বিশ্রাম দেয়। সিলিংয়ে ব্যবহৃত এমডিএফ প্যানেলগুলো তরঙ্গাকারে সাজানো, যা আলো ছড়িয়ে দেয় তরলের মতো।
আলো যেন এখানে স্থাপত্যেরই অংশ হয়ে গেছে—কখনো সরাসরি, কখনো প্রতিফলনের মাধ্যমে। মেঝেতে সবুজ–ধূসর টেক্সচার্ড কার্পেট, টেবিলে এইচপিএল ফিনিশ আর ঘরের বিভিন্ন কোণে সবুজ গাছপালা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক হাইব্রিড অন্দর, যেখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্পষ্টতা আর প্রাকৃতিক কোমলতা মেলানোর চেষ্টা দেখা যায়।
স্থপতি শরীফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা এই স্পেসে আনন্দের তরল প্রবাহকে স্থাপত্যের ভাষায় রূপ দিতে চেয়েছি। যেন প্রতিটি রেখা, বাঁক আর প্রতিফলনে সেই আনন্দের স্রোতোধারা অনুভূত হয়। গ্লাসের স্বচ্ছতা, ছাদের ঢেউখেলানো নকশা কিংবা আলোর চলমান ছায়া—সবকিছু মিলেই যেন তৈরি করে এক প্রবহমান, চনমনে পরিবেশ।’
প্রকৃতির সান্নিধ্য ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
অফিসের কাচের দেয়াল ভেদ করে দেখা যায় হাতিরঝিলের শান্ত জল। কাজের ফাঁকে কর্মীরা কফি হাতে সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে কিছুটা শান্তি খুঁজে নিতে পারেন। কেননা গাছপালা ও প্রাকৃতিক আলো কর্মীদের মানসিক চাপ কমাতে অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি দিন যেন নতুনভাবে, নতুন উদ্যমে শুরু হয়, সেই চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখা হয়নি।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
এই প্রকল্পের নান্দনিকতা ও মানবিক দর্শনের জন্য স্থপতি শরীফ উদ্দিন আহমেদ ২০২৫ সালে বাণিজ্যিক স্পেসের অন্দরসজ্জা বিভাগে অর্জন করেছেন সপ্তম বাকু আন্তর্জাতিক স্থাপত্য পুরস্কার। এই পুরস্কার দেয় ইউনিয়ন অব ইন্টারন্যাশনাল আর্কিটেক্টস (ইউআইএ) ও আজারবাইজান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে। এটি শুধু একজন স্থপতির সাফল্য নয়, বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চার জন্যও এটি এক বড় অর্জন।