সিজিপিএ–২.৭১, অফার পেয়েছেন ১২ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ভালো সিজিপিএ না-ও আসতে পারে নানা কারণে। তাই বলে কি ভিনদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যাবে? কারও কারও অভিজ্ঞতা কিন্তু বলছে, এই বাধাও অতিক্রম করার উপায় আছে।
সরকারি চাকরি নিয়ে দেশেই থিতু হতে চেয়েছিলেন আরিফ হাসনাত। কিন্তু জীবন তাঁকে ঠেলে দিয়েছে এক অসম লড়াইয়ের ময়দানে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) পুরকৌশলে পড়ার সময় যখন তাঁর সিজিপিএ কমতে শুরু করে, আশপাশে চেনা মুখগুলোও বদলে যেতে থাকে। একসময় ২.৭১ সিজিপিএ নিয়ে ব্যাচেলর শেষ করেন আরিফ। আজ তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক।
একসময় ‘মেধাবী ছাত্র’ হিসেবেই যাঁর পরিচিতি ছিল, তাঁর জন্য এমন রেজাল্ট মেনে নেওয়া কঠিন। গবেষণায় ডুবে গিয়ে তাই কষ্ট ভোলার চেষ্টা করেন আরিফ, ‘বুঝতে পারছিলাম, রিসার্চ পেপার যেহেতু ব্লাইন্ড পিয়ার রিভিউর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়, তাই এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে পরিচয় বা সিজিপিএ নয়; বরং কাজই মানুষকে প্রমাণ করে। তখন মনে হয়েছিল, রিসার্চই হয়তো একমাত্র উপায়, যার মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে পারব।’
লড়াইটা আদতে দ্বিতীয় বর্ষ থেকে শুরু হয়েছিল। বড় ভাইয়েরা যখন থিসিসের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, আরিফ তখন ফজরের আজানের পরপরই সাইকেল নিয়ে রাজশাহীর মোড়ে মোড়ে ঘুরতেন পানির নমুনা সংগ্রহের জন্য। ল্যাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ, অনলাইন থেকে গবেষণার পদ্ধতি শেখা—সবই প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গাইডলাইন ছাড়াই করেছেন তিনি। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যখন আবেদন করা শুরু করেন, তখন সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর পুরোনো সিজিপিএ। অনেক অধ্যাপক তাঁর প্রোফাইল পছন্দ করলেও একাডেমিক রেজাল্টের কারণে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আরিফ জানতেন, এমন কিছু করতে হবে, যা রেজাল্টের চেয়েও শক্তিশালী। টানা পরিশ্রম আর কৌশলী প্রস্তুতির পর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পূর্ণাঙ্গ তহবিলসহ (ফুল ফান্ডেড) অফার পান তিনি। আরিফ বলেন, ‘প্রত্যেক অধ্যাপকের ব্যাকগ্রাউন্ড খুব ভালোভাবে ঘাঁটতাম। যখন একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফান্ডিং অফার আসতে থাকে, তখন মনে হলো, এত বছরের পরিশ্রম বৃথা যায়নি।’
ভিসা পাওয়ার ঠিক পরপরই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মাকে হারান আরিফ। এই শোক তাঁকে ভেঙে দিলেও লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। ‘ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা আমি পেয়েছি, তা হলো, জীবনে হোঁচট খেলে দ্রুত উঠে দাঁড়াতে হয়। একবার শুধু পেছনে তাকিয়ে বুঝতে হয়, কেন পড়ে গেলাম। তারপর আবার সামনে হাঁটা শুরু করতে হয়। মানুষ কী বলল, কে হাসাহাসি করল—এসব আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই সেগুলোর দিকে না তাকিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোর ওপর ফোকাস করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,’ বলেন তিনি।
‘কম সিজিপিএ’র ফাঁদে অবশ্য আর পড়তে চান না আরিফ। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি সেমিস্টারে সিজিপিএ–৪ ধরে রেখেছেন এই তরুণ।