ডাকাতদের কবলে পড়ে সুন্দরবনে ৫৬ ঘণ্টা যেভাবে কেটেছে
২ জানুয়ারি সকালে সুন্দরবনের খালে ঘুরতে গিয়ে অপহৃত হন সাতজন। তাৎক্ষণিক চারজনকে ছেড়ে দিলেও দুই পর্যটক আর এক রিসোর্ট পরিচালককে জিম্মি করে রাখে ডাকাতদল। প্রায় ৫৬ ঘণ্টা পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় মুক্তি পান তাঁরা। গহিন বনে আটকে থাকার সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলোর কথাই সজীব মিয়াকে শুনিয়েছেন অপহৃত পর্যটক মো. সোহেল
নতুন বছরের শুরুর দিনটা পাঁচ বন্ধু মিলে সুন্দরবনে কাটাব, এই পরিকল্পনা করে মাসখানেক আগেই সেখানকার একটা রিসোর্ট বুক করি। ১ জানুয়ারি সকাল সাতটায় মোংলার উদ্দেশে রওনা দিই আমি, জাহিদুল ইসলাম, শিহান ইমরান, আলী সরকার আর রুহুল আমিন। দুপুরের দিকে মোংলা পৌঁছাই। সেখান থেকে যাই সুন্দরবনঘেঁষা ঢাংমারী খাল। এই খালের পাড়েই রিসোর্ট। খাওয়াদাওয়া, গল্পগুজব করেই দিন কেটে যায়।
পরদিন সকালে নাশতা শেষে নৌকায় করে বনের ভেতরের দিকে রওনা হই। আমাদের সঙ্গে রিসোর্টের একজন পরিচালক ও তাঁর এক সহকারী। তাঁরা দুজনই নৌকা চালাচ্ছিলেন।
সরু খাল বেয়ে বনের এক কিলোমিটারের মতো ভেতরে ঢুকে একটা জায়গায় থামি। এবার ফিরব। এমন সময় এক বন্ধু বলল, একটু চুপচাপ বসে পাঁচ মিনিট বনের নীরবতা উপভোগ করা যাক। ঠিক সেই সময়ই বনের ভেতর থেকে নৌকায় করে তিনজন লোক এসে আমাদের নৌকার পাশে ভেড়ে। তারা সবাই সশস্ত্র। প্রত্যেকের হাতে পাইপগান, দুজনের হাতে দা।
একজন আমাদের নৌকায় এসে ওঠে। ভয়ে এক বন্ধুর হাত থেকে তাঁর মুঠোফোনটা পানিতে পড়ে যায়। দস্যুরা আমাদের সব ছিনিয়ে নেবে ভেবে আরেক বন্ধু বুদ্ধি করে তাঁর মুঠোফোনটা আলগোছে নৌকার পাটাতনে ছেড়ে দেন। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারি তারা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে আসেনি। তারা আমাদের নৌকাটাকে খাল ধরে আরও গভীর বনে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ করে। অনেকখানি ভেতরে যাওয়ার পর নৌকা থেকে সবাইকে নামতে বলে। আমরা সাতজন একে একে নেমে পড়ি।
আমাদের মুঠোফোন, টাকাপয়সা যা ছিল সব নিয়ে নেয় তারা। কিছুদিন আগেই নতুন একটা জ্যাকেট কিনেছিলাম, সেটাও খুলে নিয়ে যায়। আমাদের এক বন্ধু ধস্তাধস্তি করায় তাঁকে মারধর করে। রিসোর্ট মালিককে পিছমোড়া করে হাত বেঁধে মারধর করে। বুঝতে পারি তাঁর ওপর দস্যুদের পুরোনো রাগ আছে।
আমরা সাতজন। ডাকাতেরা মাত্র তিনজন। ব্যাপারটা তারাও খেয়াল করে হয়তো। তাই নামানোর কিছুক্ষণ পর তারা সিদ্ধান্ত নেয় আমাকে, জনিকে (জাহিদুল ইসলাম) আর রিসোর্ট মালিককে রেখে বাকি চারজনকে ছেড়ে দেবে। তাদের ছেড়ে দেওয়ার সময় বলে দেয়, মুক্তিপণের টাকা আনলে আমাদেরও ছেড়ে দেওয়া হবে।
চারজনকে বিদায় দিয়ে আমাদের নিয়ে হাঁটা শুরু করে। গহিন জঙ্গল। চারপাশে লোনাপানি, থকথকে কাদা, শ্বাসমূলের সুচালো ডগা—হাঁটতেই পারছিলাম না। জোয়ারের কারণে কোথাও কোথাও হাঁটুপানিতে হাঁটতে হচ্ছে। ভয়ে-আতঙ্কে শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত এভাবেই হাঁটানো হয়। তারপর তারা একটা জায়গায় থামে। রিসোর্ট মালিককে দিয়ে গাছের ডাল কাটায়। সেই ডালের ওপর বসি আমরা। কিছু শুকনা ডাল সংগ্রহ করে আগুন জ্বালানো হয়। তীব্র ঠান্ডায় আগুনের পাশে জড়সড় হয়ে রাতভর থাকলাম। ডাকাতদের মধ্যে পালা করে একজন জেগে থেকে আমাদের পাহারা দিল। বাঘের ভয়ে আমরা চোখের পাতা এক করতে পারলাম না।
সেদিন দুপুরে খাইনি, রাতেও না। গলায় এক ফোঁটা পানিও পড়েনি। তেষ্টায় গলা ফেটে যাচ্ছিল। শীতের মধ্যে পাতলা কাপড়েই রাত কেটে গেল।
‘টাকা কীভাবে আদায় করতে হয়, জানা আছে’
৩ জানুয়ারি সকাল হতেই আবার হাঁটা শুরু হলো। আমাদের আরও ভেতরে নিয়ে গেল। তারপর একটা জায়গায় আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে ডাকাতসরদার কোথায় যেন গেল। ততক্ষণে কথাবার্তায় জেনে গেছি তার নাম মাসুম। কিছুক্ষণ পরই সে ফিরে এল, সঙ্গে নাশতা। বুঝতে পারলাম, লোকালয় বা বনেরই কোথাও থেকে নৌকায় খাবারগুলো দিয়ে গেছে। আমাদের প্রত্যেকের ভাগে পড়ল দুইটা করে পরোটা, ডাল আর মাংস। ডাকাতেরা বলল, এগুলো হরিণের মাংস!
২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পর পেটে খাবার পড়ল।
খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই শুরু হলো মুক্তিপণের জন্য চাপ। প্রত্যেকের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোন ধরিয়ে দেওয়া হলো। বলা হলো, দুজনের প্রত্যেককে পাঁচ লাখ করে টাকা দিতে হবে। রিসোর্ট মালিককে দিতে হবে ২০ লাখ। আমি ফোন করতে ইতস্তত করছি দেখে একজন বলে উঠল, ‘কীভাবে টাকা আদায় করতে হয়, আমাদের ভালোই জানা আছে।’ তারপর বন্দুক দিয়ে পরপর পাঁচবার আমাকে আঘাত করল। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে বাসায় বড় ভাইকে জানালাম। এর মধ্যে দেখি মাথার ওপরে একটা ড্রোন উড়ছে। ডাকাতেরা ভয় পেয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই ওই জায়গা ছাড়তে আমাদের তাড়া করে। বুঝতে পারি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাদের খোঁজ শুরু হয়েছে। তখন আমাদের আরও ঘন জঙ্গলে নিয়ে যেতে থাকে। যেতে যেতে এমন একটা জায়গায় গিয়ে থামে, যেখানটা ওপর থেকে দেখা যায় না।
ডালপালা কেটে আবার আমাদের বসানো হলো। বসে থাকতে থাকতেই সন্ধ্যা হলো। সেই সকালে দুটো পরোটা খেয়েছি। সারা দিনে পেটে আর কিছু পড়েনি। পানির তেষ্টায় কলিজা কাঠ হয়ে গেছে। এর মধ্যেই বিকট শব্দে একটা গুলি হলো। আঁতকে উঠলাম। তারপর সুনসান (পরে জেনেছি আমাদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছিল কোস্টগার্ড)।
দুশ্চিন্তায় রাতটা নির্ঘুম কাটল।
পা জড়িয়ে ধরল দস্যু সরদার
৪ জানুয়ারি সারাটা দিন বসে বসেই কাটল। অনাহারে, তৃষ্ণায় মৃত্যুভয় চেপে ধরল। পরিশ্রম না করা শরীরটা আর নিতে পারছিল না। একসময় ডাকাতদের একজন এসে বলল, ‘তোদের জন্য আমরাও খেতে পারছি না, দ্রুত টাকার ব্যবস্থা কর।’
সাড়ে ৪টার পর আচমকা ডাকাতসরদার মাসুম জানাল, আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
তারা কি মুক্তিপণ পেয়ে গেছে? নাকি কৌশলে আমাদের অন্য কোথাও নিয়ে যাবে? মনের মধ্যে এসব প্রশ্ন নিয়েই আবার হাঁটা শুরু হলো। পেটে খাবার নেই, পানিও খাইনি। পা–ই ফেলতে পারছিলাম না। দুই ঘণ্টার বেশি হাঁটার পর একটা মাটির রাস্তার দেখা পাই। অন্ধকারে চারপাশ ডুবে আছে। আমাদের সেখানেই রেখে আরও সামনের দিকে গেল দুজন ডাকাত। পরে বুঝতে পারলাম, সামনে মানুষ আছে কি না, সেটাই দেখতে গেছে তারা। একটা বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছি আমরা, মনে হলো একটা ফিশারিজ। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর কী না কী টের পেয়ে আমাদের একটা খালে নামানো হলো। ভাটার টানে খালে তখন পানি নেই। আধা ঘণ্টা কাদার মধ্যেই দাঁড় করিয়ে রাখল। তারপর মাসুমসহ দুজন এল। তাদের গলার স্বর নরম। খুবই বিনীত সুরে বলল, ‘তোমরা চলে যাও, সোজা হাঁটবা, পেছনে তাকাবা না।’
পরের কান্ডটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আচমকা পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে মাসুম বলল যে, তার মাকে নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে ফেলেছে। এই মা ছাড়া তার কেউ নেই!
তারপর বিদায় নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ডাকাতেরা।
আমরা তিনজন হাঁটা শুরু করলাম। প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর মূল রাস্তার দেখা পেলাম। সামনেই কোস্টগার্ডের টহল দলের গাড়ি। রিসোর্ট পরিচালক কেন যেন ভয় পেল। তাঁকে বুঝিয়ে সঙ্গে করে সামনে হাঁটতে থাকলাম। আমাদের দেখে গাড়ি থেকে কোস্টগার্ডের কয়েকজন সদস্য নেমে এল। তাঁদের বললাম, আমরাই অপহৃত তিনজন।
গাড়িতে করে আমাদের একটি রিসোর্টে নিয়ে যাওয়া হলো। চা, পানি খেতে দিল। জিজ্ঞাসাবাদ করল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করল। জানতে পারলাম, আমার বড় ভাই ২০ হাজার টাকা ডাকাতদলকে পাঠিয়েছে। রিসোর্ট মালিকের পরিবারের পক্ষ থেকে দিয়েছে এক লাখ। জনির জন্য আমার এক বন্ধু দিয়েছে আট হাজার। এই লেনদেনই লক্ষ রাখছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেই সূত্র ধরেই দস্যুদের কোণঠাসা করে তারা।
৫ জানুয়ারি সকালে সংবাদ সম্মেলনে আমাদের হাজির করা হলো। তারপর আরও কিছু আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমাদের পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হলো।
ভয় কত রকমের হতে পারে, এই তিন দিনে শিখেছি। বনের ভয়, অস্ত্রের ভয়, আর সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার ভয়—কখন কী হবে, কেউ কিছু জানি না।
এই অভিজ্ঞতা কোনো দিন ভুলব না।