default-image

আলীনগরের আলো

সারদা গোয়ালার বাবার বাড়ি পার্শ্ববর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর চা-বাগানে। বাবা রামভজন গোয়ালা বাগানে কৃষিকাজ করতেন। আর মা কুমারী গোয়ালা ছিলেন চা-শ্রমিক। চার বোনের মধ্যে সারদা সর্বকনিষ্ঠ। তাঁদের কোনো ভাই নেই।

বড় বোনেরা লেখাপড়া করেননি। অল্প বয়সেই তাঁদের বিয়ে হয়ে যায়। তবে সারদার লেখাপড়ায় ঝোঁক ছিল। তাঁর বাবাও চাইতেন মেয়ে পড়াশোনা করুক। আলীনগর চা–বাগানের শ্রমিক পরিবারের মেয়েদের মধ্যে একমাত্র তিনিই প্রাথমিক বিদ্যালয় উত্তীর্ণ হন। পঞ্চম শ্রেণি পাসের পর নিম্নমাধ্যমিকে ভর্তি হবেন। তখনই বাধা পড়ল। পঞ্চায়েতের লোকজন তাঁর বাবাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘তোমার মেয়ে বড় স্কুলে পড়বে কেন? সে তো বড় হচ্ছে। স্কুল দূরের পথ। কীভাবে একা যাবে?’

সারদার বাবা সোজাসাপটা জানিয়ে দিলেন, ‘আমার মেয়ে পারবে, সে পড়বে।’

পঞ্চায়েতের মুরব্বিরা শুনে বিগড়ে গেলেন। এরপর সারদা গোয়ালার পরিবারকে একঘরে করে রাখার সিদ্ধান্ত হলো। বলা হলো, কারও বাড়িতে যাওয়া যাবে না। পঞ্চায়েতের লোকজন সারদাদের সঙ্গে কথা বলবে না। সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে তাদের নিমন্ত্রণও জানানো হবে না। ভেঙে পড়লেন সারদা। কিন্তু বাবা সাহস দিলেন। বললেন, ‘তুই পড় মা, আমি পাশে আছি।’

এই সাহস সারদা গোয়ালার পথচলায় শক্তি জোগাল। বাড়ি থেকে শমশেরনগরের এ টি এম বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় দুই-আড়াই কিলোমিটার। সে স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলেন। শুরুর দিকে বাবা রামভজন গোয়ালা মেয়েকে নিয়ে যেতেন। পরে সারদা একাই রোজ স্কুলে হেঁটে যেতেন। এভাবে বছরখানেক যাওয়ার পর কী বুঝে যেন ‘একঘরে’ করার সিদ্ধান্ত বদলায় পঞ্চায়েত। সারদাদের আবার পঞ্চায়েতে যুক্ত করে তারা।

default-image

আবার ‘একঘরে’

১৯৮০ সালে এসএসসি পাস করেন সারদা। আলীনগরসহ আশপাশের বাগানে হইচই পড়ে যায়। এলাকায় চা-বাগানের মেয়ে হিসেবে তিনিই প্রথম এসএসসি পাস করেন। সারদার ভাষায়, ‘কেউ কেউ মশকরা করে বলতেন, এই মেয়েটা লেখাপড়া করে লাটসাব হইব বুঝি। আরও নানা কথা। গায়ে লাগাইনি।’

লোকজনের বিদ্রূপে অতিষ্ঠ হয়ে সারদার বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগলেন বাবা রামভজন গোয়ালা। পাত্র খোঁজা শুরু হলো।

সারদা বলেন, ‘বিয়ের কথা শুনে একদিন বাবার পায়ে ধরে বসে থাকলাম। কান্নাকাটি করতে লাগলাম।’

সারদার বাবা মেয়েকে বললেন, ‘দেখ মা, তুই বড় হয়ে গেছিস। এত দিন লেখাপড়া করেছিস। আর না। বাগানের মেয়েদের ১২-১৩ বছরেই বিয়ে হয়ে যায়। লোকে তো কথা শোনাবেই।’

সারদা গোয়ালা নাছোড়বান্দা। খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিলেন। মেয়ের একরোখা অবস্থান দেখে তাঁর বাবা বললেন, ‘তোর যা ইচ্ছা তা-ই কর।’

বাবাকে রাজি করানো গেলেও আবার বাধা হয়ে দাঁড়াল পঞ্চায়েত। আবারও তাঁদের ‘একঘরে’ করার সিদ্ধান্ত নিল তারা।

বাবা সারদাকে ডেকে বললেন, ‘কলেজে পড়বি ভালো কথা। তবে ফেল করলে কিন্তু আর কোনো কথা শুনব না, বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে।’

উপজেলা সদরে অবস্থিত কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন সারদা। দ্বিতীয় দফায় আরও প্রায় এক বছর তাঁদের পরিবারকে ‘একঘরে’ হয়ে থাকতে হয়। এরপর সারদার জেদ দেখে পঞ্চায়েতের লোকজন তাদের মত পরিবর্তন করে।

সারদা বলেন, ‘কলেজে ভর্তির পর খুব টেনশনে পড়ে গেলাম। মনের ভেতর জেদ, পাস করতেই হবে। রাত জেগে পড়তাম।’ ১৯৮৩ সালে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি পাস করেন সারদা। ফল শুনে হাসতে হাসতে বাবা নাকি তাঁকে বলেছিলেন, ‘মা, তুই তো আমারে হারাই দিলি।’

এরপর একই প্রতিষ্ঠানে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন সারদা। ১৯৮৬ সালে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

default-image

শ্রমিকের মেয়ে বলে চাকরি হলো না

দীপালী সংঘ নামে সারদাদের একটি সংগঠন ছিল। ওই সংগঠনের উদ্যোগে বাগানে প্রতিবছর সরস্বতীপূজা হতো। একবার পূজার চাঁদা তুলতে কয়েকজন মিলে আলীনগর বাগানের ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে যান। বাগানের ব্যবস্থাপক তখন নাছিম আনোয়ার। সারদার ফলাফলের কথা শুনে তাঁকে চেয়ারে বসতে বলেন তিনি। পাঁচ হাজার টাকা চাঁদাও দিয়েছিলেন। পরে ওই ব্যবস্থাপকের কাছে চাকরির আবেদন করেছিলেন সারদা। ব্যবস্থাপক রাজিও হয়েছিলেন। কিন্তু বাদ সাধেন অন্য কর্মচারীরা। তাঁরা বললেন, শ্রমিকের মেয়ে তাঁদের সঙ্গে চেয়ারে বসে কাজ করবে, এটা তাঁরা মানবেন না। বাগানে আর চাকরি করা হলো না।

১৯৮৮ সালের ৯ মার্চ মুদিদোকানি দুর্গাপ্রসাদ গোয়ালার সঙ্গে সারদার বিয়ে হয়ে যায়। তখন দুর্গাপ্রসাদদের বাড়ি ছিল জুড়ীর গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের শিলুয়া চা-বাগানে। পরে তাঁদের পরিবার কাপনাপাহাড় বাগানে চলে যায়। ১৯৯১ সালের ৩০ ডিসেম্বর চাকরিতে যোগ দেন সারদা। একে একে জন্ম নেয় দুই ছেলে দীপঙ্কর আর দেবাশীষ। ২০১৭ সালের ৪ জুলাই মারা যান স্বামী দুর্গাপ্রসাদ গোয়ালা।

সারদা জানালেন, তাঁর বড় ছেলে দীপঙ্কর যাদব স্নাতক পাস করে পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নে স্বাস্থ্য সহকারী পদে চাকরি করেন। আর ছোট ছেলে দেবাশীষ যাদব স্নাতকোত্তর পাস করে একটি প্রকল্পের আওতায় মৌলভীবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে মাঠ কর্মকর্তার পদে আছেন।

কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বিদায়বেলায় সারদা বললেন, ‘এখনো লেখাপড়া বা চাকরিবাকরিতে মেয়েদের নানা প্রতিবন্ধকতা। কখনো বাবার বাড়ি, কখনো আবার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাধা আসে। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের সাহসী, জেদি হতে হবে। তবেই সাফল্য আসবে।’

সারদায় উদ্বুদ্ধ চা–বাগানের মেয়েরা

পিছিয়ে পড়া পরিবারের সন্তানদের মধ্যে নিজের শিক্ষা ছড়িয়ে দিচ্ছেন সারদা গোয়ালা। দরিদ্র চা-শ্রমিক পরিবারের মেয়েদের লেখাপড়ায় উদ্বুদ্ধ করেন, তাদের স্বাস্থ্যসেবায় এগিয়ে আসেন, মাদক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রচারণা চালান।

সারদা বলেন, চা-বাগানের শ্রমিকেরা এমনিতেই সামান্য মজুরি পান। এর মধ্যে পুরুষদের অনেকে আবার মাদকাসক্ত। মজুরির টাকা পেয়ে সন্ধ্যায় ‘পাট্টা’য় (চা-বাগানে লাইসেন্সধারী মদের দোকান) চলে যান। নেশা করে বাড়ি ফেরেন। কেউ কেউ ঘরে তৈরি চোলাই মদ বা ‘হাঁড়িয়া’ পান করেন। এসব পান করে তাঁরা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। পরিবারেও নানা অশান্তির সৃষ্টি করেন। কর্মস্থল বাগান এলাকায় হওয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে সারদার মেলামেশার সুযোগ হয় বেশি। নারী শ্রমিকেরা প্রায়ই তাঁদের সাংসারিক নানা কষ্টের কথা বলেন। সারদা মাদক ছেড়ে দিতে পুরুষ শ্রমিকদের বোঝান। তাঁর কথা মেনে অনেকেই এ পথ ছেড়ে ফিরে এসেছেন। আবার কেউ কেউ এই নেশা ছাড়তে পারেননি।

সারদা বলেন, চা-বাগানে অপরিণত বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। ফলে বিয়ের পর তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। তিনি অপ্রাপ্ত বয়সে মেয়েদের বিয়ে না দিতেও শ্রমিকদের বোঝান। কয়েক বছর ধরে বাগানে বাল্যবিবাহ কম হচ্ছে।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন