পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন

পবিপ্রবির মূল ফটক
ছবি: প্রথম আলো

একটু মন খারাপ করেই পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) ভর্তি হয়েছিলেন কাবেরী চাকী। ঢাকার মেয়ে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়েছেন। রাজধানী থেকে এত দূরের ক্যাম্পাসে চার বছরের জন্য থাকতে হবে, মন ঠিক সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু অল্প কদিনেই ভীষণ ভালো লেগে যায় এই প্রাঙ্গণ। কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্রী বলছিলেন, ‘ঢাকার তুলনায় এখানকার পরিবেশ আসলেই আলাদা। সবুজ ক্যাম্পাসে প্রাণভরে নিশ্বাস নেওয়া যায়।’
পাবনার সুমাইয়া আলমেরও পবিপ্রবিতে পা রেখে ক্যাম্পাস সম্পর্কে ধারণা বদলেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের তৃতীয় বর্ষের এই ছাত্রী বলছিলেন, ‘একসময় ভাবতাম, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ছাত্ররাজনীতি, মারামারি, সেশনজট। কিন্তু এখানে এসে সেই ভুল ভেঙেছে।’

আরও পড়ুন

জেলা শহর থেকে বেশ দূরে পবিপ্রবির ক্যাম্পাস। এখানে কোলাহল বলতে শিক্ষার্থীদের গল্প–আড্ডা, আর পাখির কিচিরমিচির।

এক থেকে আট অনুষদ
নব্বইয়ের দশকেই পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার সদরে অবস্থিত কৃষি কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি উঠেছিল। অবশেষে ২০০০ সালের ৮ জুলাই পটুয়াখালী কৃষি কলেজের অবকাঠামোতেই পবিপ্রবির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এসেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো


৭৭ একর জায়গাজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস। সেখান থেকে পূর্ব দিকে পীরতলা বাজার পেরোলেই ৩৭ একর জমির ওপর কৃষি গবেষণা খামার। এ ছাড়া বরিশালের বাবুগঞ্জে ১২ দশমিক ৯৭ একরজুড়ে আছে বহিঃক্যাম্পাস।
শুরুটা হয়েছিল শুধু কৃষি অনুষদ নিয়ে, এখন ব্যবসায় প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা (বিবিএ), কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই), অ্যানিমেল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন (এএনএসভিএম), মাৎস্যবিজ্ঞান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান এবং ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনুষদও আছে। আটটি অনুষদে ৩ হাজার ৩৩২ জন শিক্ষার্থী পড়ছেন। শিক্ষক আছেন ২৫৪ জন। স্নাতকোত্তর ও পিএইচডির সুযোগও আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবন ও প্রচার কেন্দ্রের উপ-রেজিস্ট্রার মো. ইমদাদুল হক বলেন, ‘উদ্ভাবন কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই কেন্দ্রে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক, মৎস্যজীবী ও খামারিকে কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ ও পশুপালন সম্পর্কে হাতে–কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এক–দুই মাস পরপর ২০ জন পুরুষ ও ১০ জন নারী কৃষক ও মৎস্যজীবী প্রশিক্ষণ পান। পাশাপাশি কৃষিবিষয়ক পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে।’ তিনি জানালেন, শিক্ষা ও গবেষণায় অগ্রগতির জন্য পবিপ্রবির সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এর সুফল পাওয়া যাবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

গবেষণার হালচাল
বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই অনুষদের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান এস এম তাওহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলো। বললেন, ‘২০০২ সালে স্নাতক পর্যায়ে কৃষি শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালু হয় ইংরেজি ভাষা। আমরা আমেরিকান ক্রেডিট কোর্স সিস্টেমে পড়াই। হাতে-কলমে শিক্ষাদানের জন্য এখানে আছে ৩২টি সমৃদ্ধ গবেষণাগার। নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রাখছেন।’

লেকের মাঝখানে দৃষ্টিনন্দন সেতু
ছবি: প্রথম আলো


১৯৮৫ সালে দুমকি কৃষি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন মাহাবুব রব্বানী। পরে ১৯৯২ সালে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এখন তিনি উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান। ৩০ বছরের শিক্ষকতাজীবনে গবেষণায় জোর দিয়েছেন সব সময়। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে জাপানের সিনসু বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের ফলের ওপর গবেষণা করেছেন। মাহাবুব রব্বানী বলেন, ‘মানসম্পন্ন কৃষি গ্র্যাজুয়েট তৈরির চেষ্টা করছি আমরা। জাপানে সিনসু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের উপযোগী করে গবেষণা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। উদ্যানতত্ত্ব বিভাগে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েচে। এখানকার প্লান্ট বায়োটেকনোলজি ল্যাবরেটরিতে ছাত্রছাত্রীরা হাতে–কলমে টিস্যু কালচার এবং ডিএনএ অ্যানালাইসিস করার দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে।’ এই গবেষক জানান, উপকূলীয় অঞ্চলের ফল নিয়ে গবেষণা করেছেন তাঁরা। এরই মধ্যে দেশীয় প্রজাতির ৯টি জাতের ফল উদ্ভাবন করা হয়েছে। শিগগিরই চারা উৎপাদনের কাজ শুরু হবে। জানান তিনি।
কৃষি অনুষদের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের দুই শর বেশি গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষাজীবনে একাধিকবার স্বর্ণপদক ও সম্মানজনক সনদ পাওয়া এই গবেষক এখন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা বিনিময় করছেন। স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটির তৈরি করা বিশ্বসেরা ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় সাইফুল ইসলামের নাম আছে।

তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান এস এম তাওহিদুল ইসলাম ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) এবং ইমেজ প্রসেসিং নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণা দলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাছের রোগনির্ণয় এবং মাটিতে পানি ও সারের অবস্থা পরীক্ষণের সুবিধার্থে একটি অ্যাপ তৈরি করেছে। গবেষণালব্ধ তথ্য সায়েন্স ডিরেক্ট, স্প্রিঞ্জার লিংক, আইইইইসহ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

ক্লাসে উপস্থিত, ক্লাবেও সরব
পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম, খেলাধুলায় অংশ নেন পবিপ্রবির অনেক শিক্ষার্থী। প্রক্টর ও রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য সন্তোষ কুমার বসু জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ২০টি সংগঠন সক্রিয় আছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসে নানা আয়োজনে ক্যাম্পাস মাতিয়ে রাখেন তাঁরা।
ক্যাম্পাসের মূল সড়কের দুই পাশে আছে চোখজুড়ানো চারটি লেক। নামগুলোও সুন্দর। লাল কমল, নীল কমল, তরঙ্গ তনু ও সালসাবিল। লেক ঘিরে আড্ডা তো জমেই। সবুজঘেরা বকুলতলা, জয় বাংলা ভাস্কর্যও শিক্ষার্থীদের পছন্দের জায়গা।
বকুলতলায় একদল শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ময়মনসিংহের তাসফিয়া আক্তার ও যশোরের সাজিয়া প্রাপ্তি। দুজনই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্রী। তাসফিয়া জানান, ক্যাম্পাসে লেকের ওপর তৈরি কাঠের সেতুটি তাঁদের ভীষণ প্রিয়। সেতুর ওপর বসে, নিচে টলমলে পানি দেখার একটা আলাদা আনন্দ আছে।

প্রশাসনিক ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবক্ষ ভাস্কর্যের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন একদল শিক্ষার্থী
ছবি: প্রথম আলো



মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার চেষ্টা
প্রশাসনিক ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবক্ষ ভাস্কর্যের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন একদল শিক্ষার্থী। কৃষি অনুষদের ফাহিন, নোমান ও শমী জানান, সময় পেলেই এক হয়ে এখানে আসেন তাঁরা। জাতির জনকের পাশাপাশি এখানে আছে সাত বীরশ্রেষ্ঠের আবক্ষ ভাস্কর্য। ফাহিন বলেন, ‘এসব ভাস্কর্য আমাদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়।’ ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্রী রেজওয়ানা হিমেল বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কথা বলি আমরা। সহপাঠী, বন্ধু, শিক্ষকদের কাছ থেকে ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি।’

বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে চাই

স্বদেশচন্দ্র সামন্ত, উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: প্রথম আলো

স্বদেশচন্দ্র সামন্ত, উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য। উপাচার্য হিসেবে যোগদানের পর শিক্ষা ও গবেষণার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি। বিদেশ থেকে গবেষণামূলক প্রকল্প আনার ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছি। গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হলো ‘ফলাফলভিত্তিক পাঠ্যক্রম’। দেশের ও বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও যুগোপযোগী স্নাতক গড়ে তোলা দরকার। সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। আগামী একাডেমিক কাউন্সিলে উপস্থাপনের পর অনুমোদন সাপেক্ষে কার্যক্রম শুরু হবে।
দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকার মানুষকে দুর্যোগকালে আবহাওয়ার বার্তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আবহাওয়া স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। দুর্যোগে এই আবহাওয়া স্টেশন থেকে আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য পাওয়া যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি আদর্শ ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।