বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম নাফিস এখন কাজ করছেন ব্লুমবার্গে
২০১২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন নাফিস ইরতিজা। এরপর বুয়েটের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে সেখানেই চার বছর শিক্ষকতা করেছেন। ২০২২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ২০২৬ সালে পিএইচডি শেষ করে এখন আর্থিক ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গে মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। বুয়েটের শিক্ষকতার চাকরি থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি নিয়েছেন তিনি।
ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার খবরটি পেয়েছিলেন এক ভোরে। তখন বুয়েটের ফলাফল ওয়েবসাইটে প্রকাশের আগে দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া হতো। ময়মনসিংহে থাকায় ফলাফল দেখার সুযোগ ছিল না তাঁর। দিনটা স্মরণ করে নাফিস বলেন, ‘কোচিংয়ের এক ভাইয়ার মাধ্যমে খবরটা পাই। তিনি তখন বুয়েটের স্টুডেন্ট ছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো মজা করছেন! তারপর আরও কয়েক জায়গা থেকে শোনার পর শিওর হই।’
সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার আজকের মতো ছিল না। তবে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন ও বিলবোর্ডে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জনকারীদের ছবি থাকত। এর ফলে দেশের নানা প্রান্তে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন নাফিস। এমনও হয়েছে সিলেট কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়াতে গেছেন, সেখানেও স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা তাঁকে চিনে ফেলেছে। শুধু পরিচিতি নয়, প্রথম হওয়ার এই অভিজ্ঞতা নাফিসের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, ‘প্রথম হওয়াটা শুধু একটা একাডেমিক অর্জন ছিল না, বরং এটি দীর্ঘ মেয়াদে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
তবে ‘প্রথম’ পরিচয় পরবর্তী সময়ে আলাদা কোনো সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করেন না নাফিস। তাঁর মতে, ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট বিভাগে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। এরপরের পথ নির্ভর করে পড়াশোনা, দক্ষতা ও কাজের ওপর। কেউ কেউ এখনো ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার কথা মনে করিয়ে দেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে এর বাড়তি প্রভাব খুব বেশি নেই।
একইভাবে ‘বুয়েটের শিক্ষার্থী’ পরিচয়ের গুরুত্বও সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। নাফিস বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার ঘটনা তো এখন প্রায় ১২ বছর আগের। এই পরিচয়ের গুরুত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর হয়তো প্রথম এক সেমিস্টার পর্যন্ত থাকে। একইভাবে বুয়েটের শিক্ষার্থী হওয়ার পরিচয়ও স্নাতক শেষ করার কয়েক বছর পর ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়। আমার মনে হয়, জীবনের প্রতিটি অর্জনকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা ও ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। পুরোনো অর্জনের পরিচয়ে আটকে না থেকে প্রতিটি নতুন পর্যায়ে নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে ব্যর্থতা ও প্রত্যাখ্যানকেও স্বাভাবিকভাবে নিতে শিখেছেন তিনি। তাঁর কাছে জীবন একটি দীর্ঘ দৌড়ের মতো, যেখানে সবার শুরুর জায়গা, গন্তব্য ও এগিয়ে যাওয়ার গতি এক নয়। অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের উপযুক্ত গতি খুঁজে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই জরুরি। নাফিসের ভাষায়, ‘একটি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সাময়িক অর্জন, কিন্তু জীবনের পথচলা অনেক দীর্ঘ। এখানে ধারাবাহিকভাবে শেখা, নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং ব্যর্থতা বা প্রতিকূলতা সামলে এগিয়ে যাওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার নিজের অভিজ্ঞতাও আমাকে সেটাই শিখিয়েছে।’
ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য নাফিসের পরামর্শ, প্রথম হওয়ার লক্ষ্য নয়, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকে কাজে লাগিয়ে পড়াশোনার দক্ষতার পাশাপাশি মানসিক পরিপক্বতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। পড়াশোনা ও পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি বন্ধুত্ব এবং জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকেও গুরুত্ব দেন তিনি। নাফিস বলেন, ‘আমি বলতাম, জীবন আসলে অসংখ্য সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের সমন্বয়, যেখানে প্রতিনিয়ত নানা কিছুর মধ্যে ভারসাম্য ও সমঝোতা করতে হয়। জীবনের কোন বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেই ভারসাম্যটাই অনেকাংশে নির্ধারণ করে আপনি কতটা সফল ও পরিতৃপ্ত হবেন। আর অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুত্ব ও অভিজ্ঞতাগুলো উপভোগ করতে ভুলবেন না। জীবনের ওই সময়টা সত্যিই অনন্য, যা পরবর্তী সময়ে আর একইভাবে ফিরে পাওয়া যায় না।’