ফ্ল্যাট কিনে বুঝে না পেলে কী করবেন
দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে একটি ফ্ল্যাট কেনা স্বপ্নের মতো। অনেকেই সারা জীবনের সঞ্চয় একটি ফ্ল্যাটের পেছনে বিনিয়োগ করেন। তারপরও মাঝেমধ্যেই অভিযোগ আসে, চুক্তি অনুযায়ী সব কিস্তি পরিশোধ করে দেওয়ার পরও ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিচ্ছে না আবাসন কোম্পানি। একেক সময় একেক কথা বলে দিনের পর দিন শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা কী করবেন?
দেশে বিদ্যমান আইনে আপনি প্রতিকার চাইতে পারেন। আইনের আশ্রয় নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ফ্ল্যাটটিও বুঝে নিতে পারেন। তবে আদালতে যাওয়ার আগে আবাসনমালিকদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশে (রিহ্যাব) প্রতিকার চেয়ে আবেদন করতে পারেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফ্ল্যাট নিয়ে রিহ্যাবের সদস্যপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রাহকদের সমস্যা মেটাতে দুই দশক আগে ‘মেডিয়েশন অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস সেল’ গঠন করে রিহ্যাব। শুরুর দিকে মৌখিকভাবেই কাজটি করা হতো। ২০০৯ সালে সেটিকে আরও শক্তিশালী করা হয়। ফ্ল্যাট বুঝে না পেলে কিংবা আবাসন কোম্পানির নির্মাণকাজে সন্তুষ্ট না হলে তথ্যপ্রমাণসহ যে কেউ এই সেলে আবেদন করতে পারেন। সঙ্গে জমা দিতে হবে পাঁচ হাজার টাকা।
জানতে চাইলে রিহ্যাবের প্রথম সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘মেডিয়েশন অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস সেলের মাধ্যমে আমরা সমঝোতার ভিত্তিতে ক্রেতা–বিক্রেতার মধ্যকার সমস্যার সমাধান করি। প্রতি শনিবার এই সেলের বৈঠক হয়। সেখানে আমরা অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য তথ্যপ্রমাণসহ শুনি। এই সেলের দায়িত্বে আছেন একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক। ক্রেতা–বিক্রেতার স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়সংগত সমাধান করার চেষ্টা আমরা করি।’
লিয়াকত আলী ভূঁইয়া দাবি করেন, সেলে প্রতি মাসে ৯–১০টি অভিযোগ পড়ে। সেসব অভিযোগের ৯০ শতাংশ সমস্যাই সমাধান হচ্ছে। তবে শুধু রিহ্যাব সদস্য আবাসন কোম্পানির গ্রাহকেরাই এই সেলে অভিযোগ জানাতে পারেন। তাই কোনো আবাসন প্রতিষ্ঠানে ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার আগে সেটি রিহ্যাবের সদস্য কি না, যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
ফ্ল্যাট কেনাবেচায় ভবিষ্যতের ঝামেলা এড়াতে রিহ্যাবের এই সহসভাপতির পরামর্শ, ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার আগে আবাসন কোম্পানির চুক্তি অভিজ্ঞদের দেখানো উচিত। প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া আবাসন প্রকল্পটিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমতি আছে কি না, দেখে নিতে হবে। রাজউকের ওয়েবসাইট থেকে সহজেই সেটি যাচাই করা যায়।
আচ্ছা ধরা যাক, রিহ্যাবের ওই সেলে অভিযোগ করেও কোনো সমাধান মিলল না। তখন কী হবে? সে ক্ষেত্রে সালিস আইন, ২০০১ অনুযায়ী ক্রেতা বা জমির মালিক সালিসি ট্রাইব্যুনালের আশ্রয় নিতে পারেন। ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষ যদি ট্রাইব্যুনাল গঠনে ব্যর্থ হয়, তাহলে যেকোনো পক্ষ ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০১০’ আইনের আওতায় মামলা করতে পারে।
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ আইন অনুযায়ী, ফ্ল্যাটের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধের তিন মাসের মধ্যে ক্রেতাকে দখল হস্তান্তর ও দলিল করে দেবে আবাসন কোম্পানি। সেই সময় চুক্তির কোনো রকমফের হলে, ফ্ল্যাটের আয়তন কম বা বেশি হলে, পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে তা সমন্বয় করতে হবে। আবাসন কোম্পানি যদি নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে না পারে, তাহলে চুক্তিতে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণসহ সব অর্থ ফ্ল্যাট ক্রেতাকে ছয় মাসের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। চুক্তিতে ক্ষতিপূরণের হার উল্লেখ না থাকলে ১৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে।
আবাসন কোম্পানি যদি চুক্তিতে প্রতিশ্রুত উপকরণের পরিবর্তে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে, তাহলে ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কোনো আবাসন কোম্পানি যদি চুক্তি করার পর কাজ না করে বা আংশিক কাজ করে ফেলে রাখে কিন্তু ক্রেতাকে কোনো সুবিধা না দেয়, তাহলে তা প্রতারণামূলক কাজ বলে গণ্য হবে। সে জন্য সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। জমির মালিকের অংশ বুঝিয়ে না দিলেও একই সাজা হতে পারে।
জানতে চাইলে আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম বলেন, ফ্ল্যাট–সংক্রান্ত বিরোধ হলে প্রথমে সালিস আইনের মাধ্যমে মীমাংসায় যেতে হবে। তবে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। এখানে ব্যর্থ হলেই কেবল রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ অনুযায়ী মামলা করা যাবে। সব মিলিয়ে ফ্ল্যাট–সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। সংশ্লিষ্ট সবাই মনে করেন, এই প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন বর্ণিল বসত মে ২০২৪–এ প্রকাশিত