স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতানো ফেরান তোরেসের জীবনের এই দিকটি কি জানতেন

এ বছর ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের একমাত্র গোলদাতা ফেরান তোরেসের নামটা নিশ্চয়ই লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়। স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতানো এই ফুটবলার খেলার মাঠে যেমন নিজের দলের হয়ে লড়েন, তেমনি মাঠের বাইরে লড়েন অসহায় পথপ্রাণীর জন্য। এই লড়াইটাও আলো ছড়ায় তাঁর দেশের সীমানা ছাড়িয়ে।

প্রিয় পোষা কুকুর মাইলোর সঙ্গে ফেরান তোরেস
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

অনেকের কাছেই পথপ্রাণী, বিশেষত কুকুর একটা ‘উটকো ঝামেলা’। খাবারের খোঁজে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকা ক্ষুধার্ত প্রাণীদের তাড়িয়ে দেন অনেকেই। আঘাতও করেন। কোনো কোনো শিশুও দুষ্টুমি করতে গিয়ে উত্ত্যক্ত করে।

কখনো কখনো মানুষের এমন আচরণের কারণে কুকুর আক্রমণ করে মানুষকে। পুরো দোষটাই অবশ্য পড়ে কুকুরের ঘাড়ে। ফলাফল? কুকুরের প্রতি আরও নৃশংস হয়ে ওঠে কেউ কেউ। অথচ প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রাণের অস্তিত্বই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বজয়ী ফেরান তোরেস বলেছেন, তিনি এবং তাঁর বোন পারলে পথের সব কুকুরকে জায়গা দিতেন বাড়িতে। তবে বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর পথে পথে যত অসহায় কুকুর আছে, ওদের সবাইকে কোনো বাড়িতে ঠাঁই দেওয়া অসম্ভব একটি ব্যাপার। তাই পথের প্রাণীদের জন্য যতটা সম্ভব, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ততটাই করতে চান তিনি।

মানুষ ও প্রাণীর কল্যাণে

২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের ওয়াইল্ড অ্যাট হার্ট ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হন ফেরান তোরেস
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

মানুষকে নিরাপদ রাখতে নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণীদের সময়মতো জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া প্রয়োজন। প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বন্ধ্যত্বকরণের ব্যবস্থাও করতে হয়। তবে মানুষের কল্যাণের জন্য কোনো এলাকার প্রাণীদের অপসারণের প্রয়োজন নেই।

খাবারের সামান্য ভাগ, এমনকি উচ্ছিষ্ট পেলেও বিড়াল-কুকুর কৃতজ্ঞ থাকে। অকারণে ওরা কামড়ায় না। টিকা এবং বন্ধ্যত্বকরণের কাজগুলো প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় করার সুযোগ আছে। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে কিছু স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের কাজ করে।

২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের এমনই এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন ফেরান তোরেস। প্রতিষ্ঠানটির নাম ওয়াইল্ড অ্যাট হার্ট ফাউন্ডেশন। তোরেস তখন ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলতেন।

আরও পড়ুন

মানবতার নেই কোনো দেশ কিংবা সীমানা

ফেরান তোরেস বিশ্বজুড়ে পথকুকুরদের জন্য সচেতনতা গড়ে তুলেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

ফেরান তোরেস বিশ্বজুড়ে পথকুকুরদের জন্য সচেতনতা গড়ে তুলেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ইনস্টাগ্রামে এই তারকার ফলোয়ার এক কোটির বেশি। একটি পথপ্রাণীকে নিজের কাছে রাখার সুযোগও ছিল তখন তাঁর। তবে বাড়িতে প্রাণীকে জায়গা দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও এ ধরনের নানান কাজে যুক্ত হতে পারেন যে কেউ, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তোরেসের মতোই।

২০২১ সালেই বুলগেরিয়ার একটি গ্রামের স্ট্রিট হার্টস বিজি শেল্টার (পথপ্রাণীদের আশ্রয়কেন্দ্র) থেকে মাইলো নামের একটি কুকুর দত্তক নেন তোরেস। যুক্তরাজ্যে তাঁর সঙ্গেই রাখেন মাইলোকে। ইনস্টাগ্রামে মাইলোর ছবি পোস্ট করে অনুসারীদের জানিয়ে দেন, তাঁর পরিবারের নতুন সদস্য মাইলো।

শৈশব থেকেই কুকুর পালতেন ফেরান তোরেস। তাঁর প্রথম কুকুরের নাম ছিল রেক্স
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

নিজের নামের অংশও জুড়ে দেন ওর নামের সঙ্গে। মাইলো হয়ে যায় মাইলো তোরেস। করোনা অতিমারির একাকী দিনগুলোয় তোরেসের সঙ্গী ছিল মাইলো। পরে বার্সেলোনায় যোগ দিলে মাইলোকেও স্পেনে নিয়ে আসেন তোরেস।

এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রাণীদের নিয়ে যাওয়ার ঝক্কিটা কিন্তু কম নয়। তবে যেখানেই থাকেন না কেন, জীবনভর নানানভাবে অসহায় প্রাণীদের জন্য কাজ করতে চান এই তারকা।

মাইলোর গল্পটা

ব্রিজের নিচে পড়ে থাকা সেই অসহায় কুকুরছানাদেরই একটি ছিল এই মাইলো
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

২০২১ সালের জুন মাসে বুলগেরিয়ায় একটি সেতুর নিচ থেকে তিনটি অসহায়, ভীতসন্ত্রস্ত কুকুরছানাকে উদ্ধার করেছিল স্ট্রিট হার্টস বিজি শেল্টার। ওরা ছিল অপুষ্ট। গায়ে ছিল অজস্র পোকা।

উদ্ধারের পর শেল্টারে নিয়ে যাওয়া হয় ওদের। চিকিৎসা করানো হয় প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শমাফিক। সময়মতো দেওয়া হয় টিকা। ওরা সুস্থ হয়ে ওঠার পর সেখানকার কর্মীরা খোঁজ শুরু করেন, ওদেরকে কেউ নিজের কাছে আজীবন রাখতে পারবেন কি না।

ব্রিজের নিচে পড়ে থাকা সেই অসহায় কুকুরছানাদেরই একটি ছিল এই মাইলো। শেল্টারের তত্ত্বাবধানে জীবন বাঁচল, সুস্থ হয়ে উঠল মাইলো। তবে ভাগ্য পুরোপুরি বদলে গেল ফেরান তোরেসের অভিভাবকত্ব পেয়ে। খুব যত্নে আছে তোরেসের কাছে, তাঁর অন্যান্য পোষা কুকুরের সঙ্গে।

আরও পড়ুন

ছড়িয়ে যাক ভালোবাসা

তোরেস প্রাণীদের ভালোবাসেন। তাঁর ভালোবাসার ধরনটা এমনই
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

শৈশব থেকেই কুকুর পালতেন ফেরান তোরেস। তাঁর প্রথম কুকুরের নাম ছিল রেক্স। তোরেসের ভক্তরা হয়তো এই নামের ট্যাটুও দেখেছেন তাঁর বাঁ বাহুর বাইসেপ মাসলের নিচে। রেক্স মারা যাওয়ার পর তার নাম নিজের সঙ্গে এভাবে রেখে দেন তোরেস।

তোরেস প্রাণীদের ভালোবাসেন। তাঁর ভালোবাসার ধরনটা এমনই। সবার ভালোবাসার ধরন অবশ্য এক নয়। আপনি নিজের মতো করেই ভালোবাসতে পারেন অসহায় প্রাণীদের। আপনি যে ধর্মই অনুসরণ করুন না কেন, সেখানেও নিশ্চয়ই পেয়েছেন প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণের নির্দেশনা।

পথের প্রাণীদের সামান্য খাবার দিলে, একটু স্নেহ করলে আপনার খুব একটা বাড়তি খরচ হবে না। ওদের চিকিৎসার জন্যও প্রাণিচিকিৎসা কেন্দ্রে ছাড় পাওয়া যায়। অসহায় প্রাণীর জন্য কিছু করলে হয়তো জীবনের বহু না পাওয়া সুখ খুঁজে পাবেন আপনি। নিশ্চিতভাবেই আপনার সাফল্যের সঙ্গী হবে ওরা। দুঃসময়েও থাকবে পাশে।

সূত্র: এনবিসি ও বুলগেরিয়ান নিউজ এজেন্সি

আরও পড়ুন