এআই–নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

প্রয়োজনীয় সব দক্ষতাই ‘সিলেবাসে’ থাকবে কিংবা শিক্ষক সব হাতে ধরিয়ে শিখিয়ে দেবেন, সেই আশায় বসে থাকলে আর চলছে না। অনেক ক্ষেত্রে নিজ উদ্যোগেই ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে হবে। এআই–নির্ভর পৃথিবীতে এ কথা এখন আরও বেশি সত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন, খোঁজ নিয়েছেন আমিনা মুমতারিন

নিজ উদ্যোগেই ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে হবেছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

ইউটিউবে বিভিন্ন ফ্রি কোর্স পাওয়া যায়

শাহ্‌রিন ইসলাম, ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: শিক্ষার্থীর সৌজন্যে

শাহ্‌রিন ইসলাম, ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এআইয়ের যুগে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়া মানে প্রযুক্তির সঙ্গে নিজের জ্ঞান, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলা। তাই এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়; বরং বন্ধুত্ব করে কৌশলে তাকে কাজে লাগাতে চাই। এআই কিছু চাকরির জন্য হুমকি হলেও মানুষের মতো যুক্তিনির্ভর চিন্তা করতে পারে না। এ কারণে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং শেখার পরিকল্পনা আছে। বিশেষ করে ইউটিউবে এখন বিভিন্ন ফ্রি কোর্স সহজেই পাওয়া যায়। পাশাপাশি নোটবুকএলএম, পারপ্লেক্সিটি ও জেস্টোরের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গবেষণার দক্ষতাও বাড়াচ্ছি। কারণ, এআই তথ্য দিতে পারলেও কোনটি প্রয়োজনীয়, তা বোঝে না এবং সব সময় নির্ভুল তথ্যও দেয় না। তথ্যের প্রাসঙ্গিকতা, নির্ভরযোগ্যতা ও যথার্থতা যাচাইয়ে মানুষের নিজস্ব জ্ঞান ও বিচারবোধ অপরিহার্য।

আমার ধারণা, পাঁচ বছর পর যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও সৃজনশীলতার পাশাপাশি এআইভিত্তিক দক্ষতাও আবশ্যক হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে সৃজনশীল শিল্পক্ষেত্রের বিকাশ ঘটতে পারে। কারণ, এই ক্ষেত্র মানুষের প্রতিভা ও সৃজনশীলতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। সর্বোপরি আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা প্রযুক্তি কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করি, তার ওপর।

আরও পড়ুন

এআইকে কনটেন্ট তৈরির কাজে লাগাচ্ছি

নুর হোসাইন, টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: শিক্ষার্থীর সৌজন্যে

নুর হোসাইন, টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এআই–নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য আমি প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সৃজনশীলতা, যোগাযোগ, গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। টেলিভিশন, ফিল্ম ও ফটোগ্রাফি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে এআইকে কাজে লাগিয়ে কনটেন্ট তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ ও গল্প বলার নতুন পদ্ধতি শিখছি। চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাই ব্যবহার করে সহজেই স্টোরিবোর্ড তৈরি ও প্রি–ভিজ্যুয়ালাইজেশন করতে পারছি, যা ফিল্ম স্টুডেন্ট হিসেবে আমার অনেক কাজে আসছে। পাশাপাশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ, চলচ্চিত্র উৎসবে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে গবেষণার সুযোগ খুঁজছি।

আমার বিশ্বাস, আগামী পাঁচ বছরে এআই অনেক কাজ সহজ করবে, তবে মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচারবোধ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব থাকবে। তাই এআইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে একে নিজের দক্ষতা ও সম্ভাবনা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাই।

শুধু কোড লিখলে হবে না, সমস্যাকে গভীরভাবে বুঝতে হবে

মাইশা মুশতাক, কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
ছবি: শিক্ষার্থীর সৌজন্যে

মাইশা মুশতাক, কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

সিএসইর শিক্ষার্থী হিসেবে বুঝতে পারি, শুধু একাডেমিক শিক্ষা অর্জনই ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে প্রযুক্তির দুনিয়ায় এআই ইতিমধ্যে যে পরিবর্তন এনেছে এবং ভবিষ্যতে আরও যা আনবে, তা আমরা ভালোভাবেই উপলব্ধি করছি। তাই প্রোগ্রামিং শেখার পাশাপাশি সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। একই সঙ্গে টিমওয়ার্ক, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। এ কারণে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছি, বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দক্ষতা শাণিত করার চেষ্টা করছি। এআই টুল ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তি শেখা, কোড বোঝা ও সমস্যার সমাধান খোঁজার অভ্যাসও গড়ে তুলছি।

আগামী পাঁচ বছরে এআই কর্মক্ষেত্রের চিত্র অনেকটাই বদলে দেবে। এই পরিবর্তনের মধ্যে টিকে থাকতে হলে শুধু কোড লেখা নয়; বরং সমস্যাকে গভীরভাবে বোঝা, এআইয়ের দেওয়া উত্তর যাচাই করা এবং দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাও জরুরি হবে। তাই এআইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে এর সঙ্গে কাজ করতে শেখা এবং নিজের চিন্তাশক্তি কাজে লাগানোই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এআই ব্যবহার ও সঠিকভাবে ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য আছে

তাসফিয়া তারাননুম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস
ছবি: শিক্ষার্থীর সৌজন্যে

তাসফিয়া তারাননুম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস

আগামী পাঁচ বছরে চাকরি, শিক্ষা ও কাজের ধরন অনেক বদলে যাবে। তাই শুধু একটি দক্ষতা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেটিকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারছি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি লেখালেখি, গবেষণা, গ্রাফিকস, দৃশ্যগত যোগাযোগ ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা বাড়াতে চাই। পাশাপাশি গবেষণা, নতুন ধারণা তৈরি ও সৃজনশীল কাজে এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার শেখার চেষ্টা করছি।

তবে এআইয়ের তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা ও মানুষের অভিজ্ঞতা গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এআই ব্যবহার করতে পারা আর সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারা এক বিষয় নয়। আমার লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি শেখা নয়; বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে একজন দক্ষ লেখক, সাংবাদিক ও সৃজনশীল যোগাযোগকর্মী হয়ে ওঠা। আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মানবিক গুণাবলির সমন্বয়ই হবে এগিয়ে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি।

গতকালও যে দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজ তা অকেজো

আরাফাত নাফিজ, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: শিক্ষার্থীর সৌজন্যে

আরাফাত নাফিজ, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা এআই। শিল্পবিপ্লবের চেয়ে এটি কোনো অংশে কম নয়। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই প্রভাব ফেলছে, আর একে অগ্রাহ্য করে সামনে এগোনো এখন কঠিন। তাই এআই যথাযথভাবে শেখার চেষ্টা করছি। প্রতিদিনের কাজ থেকে শুরু করে পড়াশোনা—সবখানেই এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছি।

এআইয়ের কারণে প্রচলিত দক্ষতাগুলো প্রায়ই বদলে যাচ্ছে। গতকালও যে দক্ষতা বেশ মূল্যবান ছিল, আজ তা অকেজো। তাই সময়ের সঙ্গে মিল রেখে প্রতিনিয়ত নতুন দক্ষতা রপ্ত করার চেষ্টা করছি, আর সেই শেখার কাজেও ব্যবহার করছি এআই।

পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে লেখালেখি করি বলে নতুন তথ্য থেকে শুরু করে পুরোনো গবেষণা খুঁজে পেতে এআই আমাকে সাহায্য করছে। এআই দিয়ে নিজেকে কীভাবে আরও পরিণত করা যায়, সেটি নিয়েও কাজ করছি। এআই এখন আমার জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হ্যাঁ, এআই হয়তো অনেক পেশাকেই পুরোপুরি শেষ করে দেবে, তবে একই সঙ্গে খুলে দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। তাই পাঁচ বছর পর পৃথিবী ঠিক কোথায় দাঁড়াবে, তা বলা কঠিন। তবে এটুকু নিশ্চিত, আগামী পাঁচ বছরে পৃথিবী এআইয়ের প্রভাবে বড়ভাবে বদলে যাবে।

আমরা প্রত্যেকে এআই এজেন্টদের লিডার হয়ে উঠব

শ্রাবণ দেবনাথ, অ্যাকাউন্টিং, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: শিক্ষার্থীর সৌজন্যে

শ্রাবণ দেবনাথ, অ্যাকাউন্টিং, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এই দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে আমি প্রথমে এআই এজেন্ট ও এলএলএম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছি। এগুলো কীভাবে কাজ করে, কীভাবে সেরা ফলাফল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়, সেটাই আমার ফোকাস। ব্যক্তিগতভাবে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং শিখছি, কারণ ভালো প্রম্পট ও এআইয়ের কার্যপদ্ধতির স্পষ্ট ধারণা থাকলে আউটপুটও ভালো হয়। পাশাপাশি বিশ্লেষণী চিন্তা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা গড়ে তোলার দিকেও মনোযোগ দিচ্ছি।

পড়াশোনায় চ্যাটজিপিটি, ক্লড ও নোটবুকএলএম ব্যবহার করি। ক্লাসে বা নিজে পড়তে গিয়ে কিছু না বুঝলে, কিংবা ইউটিউবে ভিডিওতে ব্যাখ্যা না পেলে এআইয়ের সাহায্য নিই। প্রশ্ন বিশ্লেষণে নোটবুকএলএম, আর গভীর বিশ্লেষণধর্মী বিষয়ে ক্লড বেশ কাজের। গুজব ও ভুয়া খবরের এই সময়ে কোনো তথ্য অস্বাভাবিক মনে হলেও চ্যাটজিপিটি দিয়ে ফ্যাক্ট-চেক করে তবেই শেয়ার করি।

আমার মনে হয়, আগামী পাঁচ বছরে পুরো বিশ্ব এআইকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। তখন প্রম্পটিং হবে বড় দক্ষতা, আর আমরা প্রত্যেকে এআই এজেন্টদের লিডার হয়ে উঠব। আমাদের কাজ হবে নির্দেশনা দেওয়া, সঠিক ডেটা বেছে নেওয়া এবং বিচারবুদ্ধি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। প্রতিটি পেশায় তাই বিচারক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের দক্ষতার চাহিদা থাকবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এআইকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, অপব্যবহার ঠেকানো এবং এর অপ্রত্যাশিত আচরণ কমানো।