মুকুল আসার এই সময়ে আমগাছের যে যত্নগুলো নিতে হবে

আমগাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে। এ সময় একটু যত্ন নিলে আমের আশানুরূপ ফলন হতে পারে। মুকুল আসার আগে, মুকুল আসার সময় এবং মুকুল ফোটার পর—এই তিন ধাপে করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিলেন ঢাকার আসাদ গেটে অবস্থিত ফলবীথি হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রুহিদ হাসান।

মুকুল আসার আগে

আমগাছে মুকুল আসার ৩০ থেকে ৪৫ দিন আগে থেকেই গাছে পানি, সারসহ সব ধরনের খাবার দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়। ছাদবাগানের ক্ষেত্রে গাছকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে যতটুকু পানি না দিলেই নয়, ততটুকু পানি দিয়ে কোনোরকমে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। কারণ, এ সময়ে সার ও পানি পেলে গাছ মুকুল না দিয়ে নতুন পাতা ছাড়তে শুরু করে।

মুকুল আসার এক থেকে দেড় মাস আগেই প্রথমবারের মতো অনুমোদিত মাত্রায় সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক এবং ম্যানকজেব-জাতীয় ছত্রাকনাশক গাছে স্প্রে করতে হবে। কারণ, গাছে মুকুল আসার আগে গাছকে রোগমুক্ত রাখাটা খুব জরুরি। সে ক্ষেত্রে প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার কীটনাশক ও প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক মিশিয়ে স্প্রে করতে হয়। বিভিন্ন কোম্পানির পণ্যে প্রয়োগমাত্রায় ভিন্নতা থাকতে পারে। তাই স্প্রে করার আগে অবশ্যই প্যাকেটের গায়ে নির্দেশনা ভালোভাবে দেখে নিতে হবে।

মুকুল থেকে আমের গুটি আসার পর কোনোভাবেই মাটিতে পানির ঘাটতি রাখা যাবে না
কৃতজ্ঞতা: সফিকুল ইসলাম, ছবি: লেখক

আমগাছকে এফিড, থ্রিপস, মিলিবাগ ও হপার পোকার মতো কিছু মারাত্মক পোকার আক্রমণ ও এনথ্রাকনোজ এবং পাউডারি মিলডিউয়ের মতো ছত্রাকজনিত বিভিন্ন রোগ ঠেকাতে, আমের মুকুল ও ফল ঝরে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে ও সঠিক ফলন পেতে বছরে অন্তত তিনবার কীটনাশক, ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।

কীটনাশকের মধ্যে প্রতি লিটার পানিতে শূন্য দশমিক ৫ মিলিলিটার ইমিডাক্লোপ্রিড অথবা প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার সাইপারমেথ্রিন মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। ইমিডাক্লোপ্রিড সাধারণত বাজারে ইমিটাফ, কনফিডর, অ্যাডমায়ার, ইমিডাগোল্ড ইত্যাদি নামে পরিচিত। বাজারে সাইপারমেথ্রিন রিপকর্ড, সাইপার, সাইপারকিল, উইনার নামে অধিক পরিচিত।

ছত্রাকনাশকের মধ্যে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম পরিমাণ ম্যানকোজেব অথবা প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হেক্সাকোনাজল মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। ম্যানকোজেব সাধারণত বাজারে ম্যানসার নামে অধিক পরিচিত। আর হেক্সাকোনাজল টিল্ট নামে বেশি পরিচিত।

আরও পড়ুন

মুকুল আসার পরে

গাছে মুকুল আসতে শুরু করলে, মুকুল যখন ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা হয়, কিন্তু তখনো ফুল ফোটেনি—এ অবস্থায় একই অনুপাতে দ্বিতীয়বার স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করতে হবে বিকেলবেলায়। এ সময় গাছের মুকুল, পাতা ও কাণ্ড ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করা জরুরি।

নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি দিতে হবে বিশেষ করে মুকুল থেকে আমের গুটি আসার পর কোনোভাবেই মাটিতে পানির ঘাটতি রাখা যাবে না, এতে মুকুল নেতিয়ে যেতে পারে, ঝরে যেতে পারে মুকুল ও গুটি।

‎এ ছাড়া অতিরিক্ত গরম বা আর্দ্র তাপমাত্রায় প্রতি লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ইউরিয়া সার ও ১ গ্রাম বোরন সার মিশিয়ে ১০–১৫ দিন পরপর স্প্রে করলে গাছে ফল ঝরে পড়া বন্ধ হবে।

গাছে মুকুল আসছে কিন্তু তখনও ফুল ফুটেনি- এই অবস্থায় বিকেলবেলা স্প্রে করতে হবে
কৃতজ্ঞতা: সফিকুল ইসলাম, ছবি: লেখক

ফুল ফোটার সময়

ফুল ফুটে গেলে কোনো ধরনের কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা যাবে না। আমগাছে মুকুল আসার আগে স্প্রে করা যেমন জরুরি, মুকুল ফোটার পর স্প্রে করা থেকে বিরত থাকাটাও তেমনই জরুরি। কেননা মুকুল ফোটার পর যদি আমরা স্প্রে করি, তাতে ফুলের ক্ষতি হতে পারে, পাশাপাশি উপকারী পোকার জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ সময়ে ফুল ফুটলে বাগানে উপকারী পোকার আনাগোনা বেড়ে যায়। ফুলের পরাগায়নের উপকারে আসে এরা। তবে এ সময় থেকে স্বাভাবিক হারে গাছের খাবার হিসেবে নিয়মিত সার-পানি দেওয়া যাবে।

ফল বড় হতে থাকলে

ফুল শেষে ফল যখন মটরদানা আকৃতির সমান হবে, তখন তৃতীয়বারের মতো কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক স্প্রে করা ভালো। আবার ফল যখন মটরদানার আকৃতি থেকে আরেকটু বড় হয়ে মার্বেল আকার ধারণ করবে, তখন চতুর্থবারের মতো কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক স্প্রে করা যেতে পারে।

সবশেষে ফল বড় হতে থাকলে ব্যাগিং করা যেতে পারে। এতে বাইরের পোকামাকড়ের হাত থেকে যেমন ফল রক্ষা পাবে, তেমনই ফল থাকবে দাগহীন ও পরিচ্ছন্ন।

আরও কিছু বিষয়

১. ছোট গাছের মুকুল ভেঙে দেওয়া: কলমের গাছে সাধারণত প্রথম বছরে আসা সব মুকুল ভাঙার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরবর্তী বছর থেকে মুকুল না ভাঙলেও চলবে। একান্তই যদি গাছে অতিরিক্ত মুকুল থাকে তখন গাছের স্বাস্থ্য বিবেচনায় কিছু মুকুল ভেঙে দেওয়া যেতে পারে।

২. ‎ডাল ছাঁটাই থেকে বিরত থাকা: গাছে মুকুল ও ফলন বাড়াতে, রোগ-পোকার আক্রমণ ঠেকাতে, গাছের আকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে, আমগাছের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস চলাচলের জন্য, প্রতিবছর ডাল ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হয়। ডাল ছাঁটাইয়ের উপযুক্ত সময় হলো ফল সংগ্রহের পরপরই। মুকুল আসার আগে বা পরে কখনোই ছাঁটাই করা যাবে না।

৩. সার প্রয়োগ: গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টিচাহিদা নিশ্চিত করতে গাছের বয়স অনুযায়ী অনুমোদিত মাত্রায় জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণত বর্ষার আগে (মার্চ-এপ্রিল মাসে) ও বর্ষার পরে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে) বছরে এই দুবার সার প্রয়োগ করতে হয়।

৪. অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার এড়িয়ে চলা: মুকুলের সময় অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার দিলে মুকুল ঝরে যেতে পারে। বেশি নাইট্রোজেন প্রয়োগে গাছে পাতার সংখ্যা কিন্তু মুকুলের সংখ্যা কমে। তাই এ সময়ে নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে।

৫. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: গাছের গোড়ায় আগাছা, শুকনো পাতা ও ঝরে পড়া মুকুল নিয়মিত পরিষ্কার করলে রোগ ও পোকার ঝুঁকি কমে।

৬. আবহাওয়ার দিকে নজর রাখা: ঘন কুয়াশা, অতিরিক্ত বৃষ্টি বা দীর্ঘ শুষ্কতা—এসব পরিস্থিতিতে গাছের যত্নে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। ঝড়বৃষ্টিতে মুকুল ঝরে পড়া থেকে শুরু করে গাছ হেলে পড়া বা ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচতে খুঁটি বসিয়ে গাছকে অবলম্বন দেওয়া।

আরও পড়ুন