অকটেনের গাড়ি কি পেট্রলে চালানো যায়, চালালে কী ক্ষতি?

জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা চলছে। ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেলের চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে পাম্পের সামনে ধরনা দিয়ে। কেউ কেউ অকটেনের লম্বা লাইন দেখে ভাবছেন, অকটেনের বদলে আজ না হয় পেট্রলই নিলাম, তাতে কি খুব ক্ষতি হবে? অকটেনে অভ্যস্ত ইঞ্জিনে পেট্রল নিলে আসলেই কী ঘটে? জানাচ্ছেন টিভিএস মোটর কোম্পানির সিনিয়র ম্যানেজার (সার্ভিস) অমিতকান্তি পাল

অনেক পেট্রল পাম্পে জ্বালানি তেলের সরবরাহ না থাকায় এভাবে নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হচ্ছেছবি: সাইয়ান

অকটেন আসলে কী?

সহজ ভাষায় বললে, অকটেন কোনো আলাদা জ্বালানি নয়, এটি জ্বালানির দহনক্ষমতা পরিমাপের একটি একক। বাজারে যে জ্বালানিকে আমরা অকটেন নামে কিনি, সেটি মূলত উচ্চমানের পরিশোধিত পেট্রল, যার অকটেন রেটিং বেশি। সাধারণত ৯৫ বা তার বেশি।

ইঞ্জিনের ভেতরে বাতাস ও জ্বালানির মিশ্রণে যখন পিস্টন চাপ দেয়, তখন সেটি স্পার্ক প্লাগের আগুনের আগেই নিজে নিজে জ্বলে উঠতে চায়। জ্বালানি যদি এই অকালদহন রোধ করতে পারে, তবেই তাকে উচ্চমানের জ্বালানি বলা হয়। অকটেন রেটিং যত বেশি, জ্বালানি তত বেশি চাপ সহ্য করতে পারে।

অকটেনের গাড়িতে পেট্রল

গাড়ির দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষার পর পাম্পে এসে তেল নিচ্ছেন চালকেরা
ছবি: প্রথম আলো

তাত্ত্বিকভাবে পেট্রোল ও অকটেন দুটোই হাইড্রোকার্বন–ভিত্তিক জ্বালানি। তবে আধুনিক গাড়ি বা হাই-পারফরম্যান্স বাইকগুলো একটি নির্দিষ্ট কম্প্রেশন রেশিও বা চাপের পরিমাপ মাথায় রেখে তৈরি করা হয়। যদি আপনার গাড়ির ম্যানুয়ালে অকটেন ব্যবহারের নির্দেশনা থাকে, তবে সেখানে পেট্রল ব্যবহার না করাই ভালো। জরুরি প্রয়োজনে পেট্রল যদি নিতেই হয়, তবে খুব সামান্য পরিমাণে নেওয়া যেতে পারে, যাতে পরবর্তী পাম্প পর্যন্ত যাওয়া যায়। কিন্তু এটি নিয়মিত করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

ভুল জ্বালানি ব্যবহারে ইঞ্জিনের যে ক্ষতি হতে পারে

অকটেনের বদলে পেট্রল ব্যবহারে অনেক গাড়ির ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিতে পারে
ছবি: জাহিদুল করিম

যদি আপনি অকটেনের বদলে পেট্রল ব্যবহার করেন, তবে ইঞ্জিনে দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। পেট্রলের দহনক্ষমতা অকটেনের চেয়ে কম। এর ফলে পিস্টন ওপরে ওঠার আগেই জ্বালানি জ্বলে ওঠে। এতে ইঞ্জিনের ভেতর থেকে ধাতব ঠকঠক শব্দ হয়, যাকে বলা হয় নকিং। এটি ইঞ্জিনের পিস্টন ও সিলিন্ডারের মারাত্মক ক্ষতি করে। উচ্চক্ষমতার ইঞ্জিনে পেট্রল ব্যবহার করলে গাড়ি তার স্বাভাবিক শক্তি হারায়। আপনি অ্যাকসিলারেটর চাপলেও গাড়ি আগের মতো গতি পাবে না এবং মাইলেজ দ্রুত কমতে থাকবে। এ ছাড়া অকটেন অনেক বেশি পরিষ্কারভাবে জ্বলে। বিপরীতে পেট্রল পুরোপুরি না জ্বলার কারণে ইঞ্জিনের ভাল্‌ভ এবং স্পার্ক প্লাগে কার্বনের আস্তরণ জমা হয়। এতে ইঞ্জিনের আয়ু কমে যায়। ভুল জ্বালানি ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিনের দহনপ্রক্রিয়ায় অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, যা ইঞ্জিনকে দ্রুত গরম করে তোলে। দীর্ঘক্ষণ এভাবে চললে ইঞ্জিন সিজ করার ঝুঁকি থাকে।

আরও পড়ুন

খেয়াল রাখুন

গাড়ির সঙ্গে থাকা ইউজার ম্যানুয়াল দেখে জ্বালানি ব্যবহার করা উচিত
ছবি: প্রথম আলো
  • প্রতিটি গাড়ির সঙ্গে একটি ইউজার ম্যানুয়াল থাকে। সেখানে স্পষ্ট লেখা থাকে, আপনার গাড়ির জন্য কত রেটিংয়ের জ্বালানি প্রয়োজন। সেটি মেনে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ।

  • অনেকেই মনে করেন, অর্ধেক পেট্রল আর অর্ধেক অকটেন মিশিয়ে নিলে সাশ্রয় হবে। এটি ভুল ধারণা। এতে জ্বালানির মান ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে এবং সেন্সরযুক্ত আধুনিক ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়।

  • যদি ভুলবশত পেট্রল ব্যবহার করে ফেলেন, তবে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ মেকানিক দিয়ে স্পার্ক প্লাগ এবং ফুয়েল ফিল্টার পরিষ্কার করিয়ে নিন।

  • শুধু অকটেন বা পেট্রল বাছাই করলেই হবে না, জ্বালানির মান যেন খাঁটি হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তাই বিশ্বস্ত পাম্প থেকে জ্বালানি নিতে চেষ্টা করুন।

সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে বা আলসেমি করে অকটেনের বদলে পেট্রল ব্যবহার করলে সাময়িকভাবে গাড়ি চললেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি আপনার পকেটের ওপর বড় ধাক্কা দিতে পারে। আপনার বাহনটি যদি আধুনিক প্রযুক্তির হয়, তবে তার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সব সময় নির্দিষ্ট মানের জ্বালানি ব্যবহার করুন।

আরও পড়ুন