শিক্ষার্থীদের দেখা পেতে ঢুকে পড়ি পুরকৌশল ও যন্ত্রকৌশল অনুষদের ভবনে। ঢুকতেই হাতের ডানে পড়ল পুরকৌশলের ল্যাব। ২০-২৫ শিক্ষার্থী সেখানে পূর্ণ মনোযোগে ক্লাস করছেন। একই দৃশ্য চোখে পড়লে যন্ত্রকৌশল অনুষদে। কথা বলার সময় নেই কারও।

গাজীপুর শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)। ২৩ দশমিক ৪২ একরজুড়ে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়টির চারদিকে সবুজের বেষ্টনী। দেশের বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পাস করা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য একমাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এটি। এখানে গবেষণা ও পড়াশোনা চলছে সমানতালে। তাই তো দেশের আনাচকানাচ থেকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হয়ে যাঁরা বের হন, প্রায় সবারই লক্ষ্য থাকে ডুয়েটে পড়ার।

করোনাকালীন স্থবিরতার সময়েও ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম থেমে থাকেনি। ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৫৪৩ শিক্ষার্থী স্নাতক এবং ৩৫ শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পেয়েছেন।

default-image

১২০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার

১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদ হিসেবে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। দেশে ক্রমবর্ধমান আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে এই বিশ্ববিদ্যালয় পুরকৌশল, যন্ত্রকৌশল ও তড়িৎ কৌশল অনুষদের অধীন ৯টি ভিন্ন বিভাগে চার বছর মেয়াদি ব্যাচেলর ডিগ্রি দিচ্ছে। ১৯৮০ সালে ১২০ শিক্ষার্থী নিয়ে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে পথচলা শুরু। ১৯৮৩ সালে কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নাম পরিবর্তন করে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (ডিইসি) নামে গাজীপুরের বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল। সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে সরকারের অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ডিইসিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি) ঢাকাতে রূপান্তর করা হয়। সব শেষে ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে আত্মপ্রকাশ করে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

সে হিসাবে বয়স মাত্র ১৯ বছর। তবে তারও আগে, ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্সের অধীন যাত্রা শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিশে আছে অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন-গল্প। তখন ছিল মাত্র ৮ জন শিক্ষক আর ১২০ জন শিক্ষার্থী। নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এখন এখানে সাত বিভাগে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থী পড়ছেন। চারটি অনুষদের অধীন আটটি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে। বিভাগের সংখ্যা মোট ১৩টি। ছাত্রদের পাঁচটি ও ছাত্রীদের জন্য দুটি আবাসিক হল আছে। ২০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিবছর ৬৮৬ জন শিক্ষার্থীকে ভর্তি নেওয়া হয়। এ ছাড়া পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন বিভাগে মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারেন।

default-image

ক্যাম্পাসে রয়েছে বেশ কয়েকটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। প্রায়ই এখানে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। সৃজনী, ডুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি, ডুয়েট রোবোটিকস ক্লাব, ডুয়েট কম্পিউটার সোসাইটি, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, ডুয়েট স্পোর্টিং ক্লাব, ডুয়েট চেস ক্লাব, ডুয়েট এনভায়রনমেন্ট ক্লাবসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন সারা বছর ক্যাম্পাস মাতিয়ে রাখে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতা থেকে বেশ কিছু পুরস্কার অর্জন করেছেন ডুয়েটের শিক্ষার্থীরা। নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশা আলোড়িত করে এখনকার অনেক শিক্ষার্থীকে।

ডুয়েটের সাম্প্রতিক গবেষণা

ন্যানো টেকনোলজিকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বমানের গবেষণার চেষ্টা চলছে ডুয়েটের ল্যাবগুলোতে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানালেন, জিরকোনিয়াম, সিলভার, অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড, টাইটানিয়াম, বোরনসহ বিভিন্ন ধরনের ন্যানো পার্টিক্যাল তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রাফেনের মতো ‘টুডি ম্যারেটিয়াল’ও তৈরি হচ্ছে এখানে, যা সেমিকন্ডাক্টর, ন্যানো ইলেকট্রনিক ও ন্যানো অপটিক্যাল ডিভাইসে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বায়োমেডিকেল খাত, এনার্জি স্টোরেজ, পানি পরিশোধনসহ নানা ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া বোরোফেনের মতো ‘টুডি ম্যাটেরিয়াল’ তৈরির নতুন দুটি পদ্ধতিও আবিষ্কার করা গেছে। এরই মধ্যে সেগুলো আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে। ন্যানোফাইবারাস মেমব্রেন, নতুন ধরনের থ্রিডি ম্যাটেরিয়াল, ন্যানো কম্পোজিট, হাইব্রিড কম্পোজিট বায়োপ্লাস্টিকসহ আধুনিক ম্যাটেরিয়াল তৈরির প্রক্রিয়াও চলমান।

দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে এসব উপাদান তৈরি করা যায় কি না, তার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। গুণাগুণ পরীক্ষা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারও করা হচ্ছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য, পাটের আঁশ, কলাগাছের আঁশ, কচুরিপানাসহ এ ধরনের বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেগুলোকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে।

এসব গবেষণা প্রসঙ্গে ডুয়েটের গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘এ ধরনের ম্যাটেরিয়ালগুলোর চাহিদা সারা বিশ্বে ক্রমাগত বাড়ছে। বাংলাদেশে ম্যাটেরিয়ালগুলো তৈরির শিল্পকারখানা গড়ে তোলার সুযোগও আছে, যেগুলো দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্যে পরিণত হতে পারে। শিল্পোদ্যোক্তারা এ বিষয়ে এগিয়ে এলে দেশের অর্থনীতি আরও এগিয়ে যেতে পারে। আমাদের ডুয়েটের তরুণ গবেষকেরা সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছেন।’

চাকরির জন্য বসে থাকেন না তাঁরা

কথা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি উৎপল কুমার দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও শিক্ষার্থীরা চাকরির জন্য বসে থাকেন। আমাদের শিক্ষার্থীদের ছয় মাসও বসে থাকতে হয় না। অনেক শিক্ষার্থী পাস করার আগেই ক্যাম্পাসের জব ফেয়ারে অংশগ্রহণ করে চাকরি পেয়ে যাচ্ছেন। মেটা, টেসলার মতো বড় প্রতিষ্ঠানেও আমাদের শিক্ষার্থীরা কাজ করছেন।’

পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাজু আহমেদ জানালেন, তাঁদের নিয়মিত ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। তিনি বলেন, কোনো কারণে ক্লাস বা ল্যাব মিস হয়ে গেলে নিজেরই বেশি ক্ষতি হয়। তাই সহজে কেউ ক্লাস মিস করে না। কেমিক্যাল অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী যোবায়ের হোসেন বলেন, ‘একসময় চিন্তা হতো ডিপ্লোমা করেছি, কিন্তু পরবর্তীকালে আমার কী হবে। এখন আর সেটা মনে হয় না। প্রকৌশলীদের জন্য দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ায় আমরা গর্ববোধ করছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা জানালেন, ডুয়েটে বর্তমানে সাতটি হল আছে। হলগুলোর খাবার বাবদ দিনে ৫০ টাকা করে মাস শেষে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। এসএম হলের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, ‘হলে থাকলে সব মিলিয়ে মাসে প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হয়। বর্তমান বাজারের সঙ্গে এটা মোটামুটি মানানসই। তবে হলে আসন তো খুব বেশি নেই। যারা বাইরে মেসে থাকে, তাদের আরও বেশি খরচ হয়। আমরা যারা হলে আছি, ভালোই আছি।’

ক্যাম্পাসের পরিধি, শিক্ষার মান বাড়াতে চাই

default-image

এম হাবিবুর রহমান, উপাচার্য, ঢাকা প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে আরও উন্নত ও সম্প্রসারিত করতে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম জায়গা ডুয়েটে। এখানে ছিল ২৩ দশমিক ৪২ একর। মূল ক্যাম্পাসের সঙ্গে জায়গা না থাকায় ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে কিছু জায়গা নেওয়া হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য হল ও কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ চলছে। আরও জায়গা নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। বর্তমানে একটি আধুনিক প্রশাসনিক ভবনসহ বেশ কিছু উন্নয়নকাজ চলছে। ক্যাম্পাসের পরিধি ও শিক্ষার বাড়ানো আমাদের মূল লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে এখানে ছয় মাসের একাডেমিক ক্যালেন্ডার করা হতো। এখন এক বছরের করা হচ্ছে। সেই একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আমরা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন