গানের মানুষ

নারায়ণগঞ্জ শহরের মিশনপাড়া এলাকায় বড় হয়েছেন হাশিম মাহমুদরা। আট বছর আগে নিজেদের এই বাড়িতে আসেন। এখানে মা জমিলা আক্তারের সঙ্গে থাকেন হাশিম মাহমুদ। অসুস্থতার জন্য বাইরে তেমন একটা বের হন না। পরিবারে তাঁর ভাইবোন, কিছু আত্মীয়স্বজন আছেন। তাঁরাই হাশিমের দেখাশোনা করেন। সেদিনও বাড়িতে ছিলেন ছোট বোন দিলারা মাসুদ ও ছোট ভাই বেলাল আহমেদ। বসার ঘরে তাঁদের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিই।
‘ছোটবেলা থেকেই গান গায় হাশিম। থালা, বাটি, চামচ ছিল ওর বাদ্যযন্ত্র। আপন মনে একটার পর একটা গান গাইত,’ ছেলেকে নিয়ে বলেন মা জমিলা আক্তার।
নারায়ণগঞ্জ শহরের লক্ষ্মীনারায়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনায় হাতেখড়ি। ১৯৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল থেকেই এসএসসি। এরপর সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে এইচএসসি ও স্নাতক করেন হাশিম মাহমুদ।
ছোটবেলাতেই নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংগঠন শাপলার সঙ্গে যুক্ত হাশিম মাহমুদ। আরও কয়েকটি সংগঠনেও যাতায়াত ছিল। আড্ডাবাজ মানুষ হিসেবে ছোট-বড় সবার প্রিয় মানুষ হাশিম মাহমুদ। নিজে ছড়া লিখতেন, ছড়া নিয়ে অনুজ ও অগ্রজদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। সেসব নিয়মিত প্রকাশিত হতো বিভিন্ন পত্রিকায়। ছড়া নিয়ে দপাশ নামে একটি বইও প্রকাশ করেছিলেন। তখন থেকে নিজে যেমন গান লিখতেন, তেমন সুরও করতেন। নারায়ণগঞ্জের স্টেজেও তাঁকে দেখা যেত।

চাকরিতে যোগ দেননি হাশিম

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকামুখী হয়ে ওঠেন হাশিম মাহমুদ। ভর্তি হন ছায়ানটে। রবীন্দ্রসংগীতের ওপর তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে নজরুলসংগীতের ওপরও দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়েছেন। ঢাকায় হাশিম মাহমুদের প্রিয় প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে চারুকলা। সময় কাটাতেন ছবির হাট, পাবলিক লাইব্রেরি ও শাহবাগে। শিক্ষার্থী না হয়েও শিক্ষার্থীদের মতো প্রতিদিন সকালে চারুকলায় চলে আসতেন হাশিম মাহমুদ। সারা দিন থেকে গভীর রাতে ফিরতেন বাড়ি। কয়েকজনকে নিয়ে সেই সময় একটি ব্যান্ডও করেছিলেন মাহমুদ। নাম দিয়েছিলেন ‘বৈরাগী’। তিনি ছিলেন ভোকাল।
এসব করতে গিয়ে নিজের দিকে তাকাননি হাশিম। চাকরির পেছনেও ছোটেননি। শিল্পসাধনায় মগ্ন থাকতে চেয়েছেন। মানুষকে ভালোবেসে বিনোদিত করতে চেয়েছেন। এসব করতে করতে কখন যে বেলা গড়িয়ে গেছে, সেই হিসাব মেলানোর সময় তাঁর হয়ে ওঠেনি। সংসার পাতা হয়নি। রয়ে গেছেন অকৃতদার।
বেলাল আহমেদ বলছিলেন, টাকাপয়সা, বাড়ি–গাড়ির প্রতি কোনো মোহ তাঁর ছিল না। ‘স্যার’ বলতে হবে বলে একটি ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার পদে চাকরি পেয়েও যোগ দেননি। দিলারা মাসুদ বলেন, ‘হাশিম ভাই কিছুটা আত্মভোলা প্রকৃতির মানুষ। ছোটবেলা থেকেই তিনি এমন। অনেকে বলেন তিনি অসুস্থ। তা কিন্তু না।’

হাশিমের বাবাও গান লিখতেন

বেলাল বলেন, ‘বাবাও গান লিখতেন।’ হাশিম মাহমুদের বাবা আবুল হাশেম বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ছিলেন। প্রয়াত হয়েছেন। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে হাশিম মাহমুদ তৃতীয়।

default-image

সাদা সাদা কালা কালা

বুধবার দেখা না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার আবার হাশিম মাহমুদের বাড়ি যাই। বসার ঘরে গণমাধ্যমকর্মী, প্রতিবেশীসহ অনেকেই আছেন। মেঝেতে পাতা বিছানায় বসে আছেন হাশিম মাহমুদ, পরনে নেভি ব্লু ট্রাউজার ও সাদা-কালো স্ট্রাইপের টি-শার্ট। তবে তিনি কথা বলছেন না। একটার পর একটা গান গাইছেন। পাশে বসে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সংগত করছেন হাশিমের বড় ভাই রাশেদুল হাসান।
হাশিম মাহমুদের লেখা ‘সাদা সাদা কালা কালা’ গানটি চলচ্চিত্র ‌হাওয়ায় ব্যবহার করেছেন পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন। হাশিম মাহমুদের কথা ও সুরে গানটি গেয়েছেন এরফান মৃধা। খমক ছাড়া গানটিতে আর কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। নৌকার সব কাঠ, বাঁশ, হাঁড়ি, পাতিল বাজিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গানটির সংগীতায়োজন করেছেন ইমন চৌধুরী। আর এই অবাদ্যযন্ত্রগুলো বাজিয়েছেন মিঠুন চক্র। ইউটিউবে গানটি প্রকাশের পরই সাড়া পড়ে গেছে।
এক ফাঁকে হাশিম মাহমুদকে জিজ্ঞেস করি, ভাইরাল হওয়া গানটি সম্পর্কে তিনি জানেন কি না। উত্তরে কিছু অসংলগ্ন কথা বললেন হাশিম মাহমুদ। একসময় বলেন, ‘আমার গান একদিন ভাইরাল হবে, সেটি আগেই জানতাম। তবে কবে হবে, সেটা জানতাম না। এখন অনেক ভালো লাগছে!’
‘সাদা সাদা কালা কালা’ গানটি লেখার অনুপ্রেরণা কীভাবে পেলেন জানতে চাইলে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারলেন না তিনি। তবে সে গল্প আমরা শুনেছিলাম দিলারা মাসুদের কাছে। একবার কুষ্টিয়ার লালন আখড়ায় এক মেয়েকে পছন্দ হয় হাশিম মাহমুদের। মেয়েটার গায়ের রং ছিল কালো। সেই মেয়ের উদ্দেশে মুখে মুখে ‘সাদা সাদা কালা কালা’ গানটি বাঁধেন হাশিম। তবে সেই মেয়েটিকে নিজের পছন্দের বিষয়টি বলতে পারেননি। তবে জানতে পেরেছিলেন, মেয়েটি লালন শাহর ওপর গবেষণা করতে সেখানে গিয়েছিলেন। দিলারা মাসুদের ধারণা, মেয়েটিকে ভালোবাসার কথা না বলতে পেরে আর বিয়ে করেননি হাশিম মাহমুদ।
গান ও কথার মধ্যেই মায়ের কাছে পানি চান হাশিম মাহমুদ। পানি পান করে আবার গলা ছাড়লেন, ‘আগুন নিয়ে খেলছ তুমি, আগুন চিনলা না বন্ধু, পিরিতি শিখাইয়া তুমি বন্ধু গো...।’
হাশিম মাহমুদ মায়ের নেওটা। জমিলা আক্তারও ছেলেকে আগলে রাখেন সব সময়। একটু পর আবার আসেন তিনি। ঘরে মানুষ বাড়তে থাকে। বুঝতে পারেন ছেলের ওপর চাপ পড়ছে। সবাইকে বলেন, ‘ওকে বেশি প্রেশার দিয়েন না। কয়েক দিন ধরে ওর ওপর দিয়ে অনেক প্রেশার যাচ্ছে।’
আমরা তাই হাশিম মাহমুদকে বিদায় বলি।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন