বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, শব্দের এত শক্তি
হ্যামনেট চলচ্চিত্রে অভিনয় করে এ বছর অস্কার জিতেছেন আইরিশ অভিনেত্রী জেসি বাকলি। তাঁর বেড়ে ওঠাটা কেমন ছিল, ফিল্ম কমেন্ট-এর এক সাক্ষাৎকারে সে গল্পই শুনিয়েছেন তিনি। পড়ুন নির্বাচিত অংশ।
আমি আমার বাড়ি বড্ড মিস করি। মাঝেমধ্যে মনে হয়, দিন দিন আমার বাড়ি, আমার শিকড় থেকে ততটাই দূরে সরে যাচ্ছি, যতটা যাওয়া সম্ভব। কিন্তু মনের ভেতরে আমি তো জানি আমি কে, কোথা থেকে এসেছি। তাই সুযোগ পেলেই বাড়ি ফিরি। নিজের শিকড় আর নিজেকে খুঁজে ফিরি। পৃথিবীকে আমি যেভাবে দেখি, তা তো অনেকটাই গড়ে উঠেছে আমার ছোটবেলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সেই সময়ের পর থেকে যেসব অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা যা দেখেছি—সেগুলোই আমাকে বদলেছে।
আমি কিলার্নিতে বড় হয়েছি। আয়ারল্যান্ডের একটি হ্রদঘেঁষা শহর। বাবা একটা গেস্টহাউস চালাতেন। শহরের মাঝখানে আমাদের একটা পাব আর একটা হোটেলও ছিল। বেশ পুরোনো।
মা হার্প বাজাতেন, গানও গাইতেন। তিনি আয়ারল্যান্ডের একটু উত্তরের একটা কাউন্টিতে বড় হয়েছেন, পরে কেরিতে চলে আসেন। যে হোটেলে মা হার্প বাজাতেন, সেখানেই বাবার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। বাবাই আগ বাড়িয়ে বলেছিলেন, ‘হ্যালো, একটা কবিতা শুনতে চাও?’
গান, বাঁধভাঙা আবেগ আর একরকম বেখেয়ালি স্বাধীনতার মধ্যে আমরা বড় হয়েছি। জীবনটাই কেমন যেন বুনো ছিল। পাহাড়ের কোলে থাকতাম। বাইরে বেরোলেই দেখতাম প্রাকৃতিক বন। কেউ লাগায়নি, তবু গাছেরা জন্মাচ্ছে, বেড়ে উঠছে। সব যেন নিজের মতো করে ঘটছে।
আমাদের পরিবারের চর্চাটাও এমনই ছিল। গান শিখতে চাও? পিয়ানো শিখতে চাও? শেখো! মা-বাবা চাইতেন আমরা এসব অভিজ্ঞতা অর্জন করি। বস্তুগত কোনো কিছুর প্রতি তাঁদের কোনো আগ্রহ ছিল না। আমাদের কখনো অতিরিক্ত আদরযত্নে বড় করা হয়নি। কিন্তু মা-বাবা খুব ভালো কিছু মূল্যবোধ শিখিয়েছেন—জীবনে কী গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বুঝিয়েছেন। এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
যখন খুব ছোট ছিলাম, অপেরার প্রশিক্ষণ নিতে, ক্ল্যাসিক্যাল সিঙ্গার হতে লন্ডনে গিয়েছিলেন মা। তখন লন্ডনেই থাকতাম। মনে আছে, আমি তখন ডায়াপার পরা এক ছোট্ট শিশু, মায়ের ক্লাসের পেছনে বসে থাকতাম। আমাকে ঘিরে থাকত অনেক গায়ক–গায়িকা। সেই সময়ের যে স্মৃতিটা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে মনে পড়ে, সেটা হলো মা ‘পিপল টু পিপল’ নামে আমেরিকান ট্যুর গ্রুপের জন্য গান গাইতেন। তরুণ শিক্ষার্থীদের এই দল আয়ারল্যান্ড আর ফ্রান্সে ঘুরতে আসত। সেই সময়ই সম্ভবত মায়ের দিকে ভিন্ন চোখে তাকিয়েছিলাম। মনে হতো, মা খুব নিঃস্বার্থ একটা কাজ করছেন, যেন সেই পর্যটকদের কিছু উপহার দিচ্ছেন।
ছোট্ট হলঘরে দাঁড়িয়ে মা গল্প বলতেন, গান গাইতেন, একদম নিজেকে উজাড় করে। যেন বিশাল কোনো মঞ্চে গাইছেন, তাঁর কাছে ওটাই যেন কার্নেগি হল। অথচ আমরা ছিলাম ছোট্ট একটা টাউন হলে আর সামনে জনাকয়েক মার্কিন শিক্ষার্থী, যারা হয়তো সে সময়ের (আশির দশক) পপ গানেই বেশি আগ্রহী। কিন্তু ঠিকই তাদের মন জয় করে নিতেন মা। আমার কাছে পুরো পরিবেশনাটাই কেমন যেন জাদুকরি মনে হতো!
সে সময় আমার একজন পিয়ানো শিক্ষক ছিলেন। নাম উলা। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি আমাকে পিয়ানো দিয়ে ছবি আঁকতে বলেছিলেন। তিনি বলতেন, মনে মনে একটা ছবি কল্পনা করো, তারপর পিয়ানোর সুরে সেই ছবিটা আঁকো।
যেহেতু মেয়েদের স্কুলে পড়তাম, কখনো কখনো স্কুলের নাটকে আমাকে ছেলে চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছে। ওয়েস্ট সাইড স্টোরির টনি চরিত্রেও অভিনয় করেছিলাম। ভাগ্যিস, সেই সময়ের কোনো ভিডিও নেই!
কখনোই পরিকল্পনা করে কিছু করিনি। সিনেমায় কাজ করব—এমনটা তো ভাবিইনি। ওটা যেন অনেক দূরের কিছু বলে মনে হতো। কিন্তু যখন লন্ডনে গেলাম, তখন রয়্যাল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টে চার সপ্তাহের একটা ‘শেক্সপিয়ার কোর্স’ করার সুযোগ পেয়ে গেলাম। স্কুলে এক-আধটু করেছি আগে, কিন্তু ওটা তো একরকম ছেলেমানুষি ছিল। কোর্সটা করতে গিয়ে বিরাট ধাক্কা খেলাম। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, শব্দেরও এত শক্তি থাকতে পারে! প্রতিটি শব্দই যেন অদ্ভুত পরিপূর্ণ। প্রতিবার উচ্চারণ করতে গিয়েই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছিলাম।
ড্রামা স্কুলে পড়তে লন্ডনে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরে একটা অনুষ্ঠানে জড়িয়ে গেলাম। তারপর একটা কাজ পেলাম। এরপর আবার জ্যাজ গাওয়া শুরু করলাম। একসময় এজেন্টকে বললাম, ‘আবার পড়াশোনা করতে চাই।’ সে বলল, ‘করো।’
সত্যি বলতে নিজের বয়সী মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করছিল। শুক্রবারে পাবে গিয়ে একটু মজা করা, স্বাভাবিক জীবনযাপন করা, যেমনটা এই বয়সের মানুষ করে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পা রেখে দেখলাম, সবকিছুই কেমন যেন একটা নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা। কী করব, কী গাইব—সব ঠিক করা। আমার ভালো লাগেনি।
বিস্ট সিনেমায় মূল চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে আমি একটা জিনিস শিখেছি। সমাজ আমাদের সব সময় বলে দেয়, কী ভালো, কী খারাপ। কীভাবে আচরণ করলে নির্বিঘ্নে থাকা যাবে। কিন্তু আমি কেমন, সেটা তো নির্ভর করে আমি কোথায় বড় হয়েছি, কী পরিবেশে ছিলাম, জীবনে কী কী ঘটেছে—এসবের ওপর। আমি কে, সেটা আমার ছেলেবেলাই ঠিক করে দেয়। (ঈষৎ পরিমার্জিত)