একসময় মুসলিম বিয়েতেও ধামাইলের আসর বসত, তাতে আমাদের ডাক পড়ত। ধামাইল প্রাচীন ধারার লোকসংগীত। হাওর অঞ্চলেই এ গানের উৎপত্তি। আমরা সারারাত বাজনা বাজাতাম। লোকজন খুশি হয়ে বকশিশ দিত।

আমাদের জগন্নাথপুর উপজেলায় পাঁচ শতাধিক শব্দকর পরিবার ছিল। এখনো দুই শতাধিক আছে। তার মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবার এখনো বাদ্যবাজনায় যুক্ত। বাকিরা অন্য নানা পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। শব্দকর পরিবারের সন্তান হিসেবে আমি নিজে গর্ববোধ করি। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের একেকটি বাজনা একেকটি শিক্ষা।

আমাদের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় ঢাক বাজানো হয়। ধামাইল গানের স্রষ্টা রাধারমণ দত্ত এ উপজেলার কৃতী সন্তান। তাই আমাদের অঞ্চলে ধামাইল গানের আসর বসত, প্রতিযোগিতা হতো। এসব আসরে আমরা বাজাতাম। ভালো লাগত।

অপমান থেকে সরে এসেছি

ছোটবেলা থেকে আমার মধ্যে অপমানবোধটা প্রবল। একসময় দেখলাম নিম্নবর্ণের মানুষ বিবেচনা করে আমাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। অনেক বাড়িতে বাজনা বাজাতে গেলে খাওয়াদাওয়ার সময় অতিথিদের সঙ্গে খেতে দেওয়াও হতো না। আলাদা খাবার খাওয়ানো হতো। এসব অবহেলা খুব কষ্ট দিত। দিনে দিনে কাজও কমে যাচ্ছিল। তার মধ্যে আবার অপমান। তাই আমি নিজেই বাপ–দাদার এ পেশা থেকে সরে যাই। চাকরি নিই একটি করাতকলে।

আমি অবহেলা থেকে সরে এলেও অনেকে বাধ্য হয়েই ছেড়ে দিয়েছেন। বিয়েশাদিতে আমাদের বাজনা না এনে এখন শিল্পীসহ ব্যান্ড আনা হয়। ধামাইলের পরিবর্তে রাতভর চলে গানবাজনার আয়োজন।

আমার দুই ছেলে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। একজন সেলুনের কাজ করছে, আরেকজন ঢাকায় পোশাককর্মী হিসেবে কাজ করছে। সেলুনে কাজ করা ছেলে গৌরাঙ্গ শব্দকরের আয় দিয়ে কোনোরকম খেয়ে না খেয়ে চলে আমাদের সংসার।

এমন বন্যা আগে দেখিনি

আমি পৌর শহরের হবিবনগর এলাকায় এক প্রবাসীর জায়গায় বাড়ি করে বসবাস করছি। জন্মসনদ অনুযায়ী বয়স আমার ৮৪, আদতে আরও বেশি। কালে কালে কত বন্যা দেখেছি। কিন্তু এবারের মতো ভয়াবহ বন্যা আগে দেখিনি। ঘরে পানি ঢুকে পড়েছিল। স্ত্রীসহ আরও অনেকের সঙ্গে পৌর ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কী যে কষ্টে কাটল কয়টা দিন। বয়স্ক মানুষ, কারও কাছে হাতও পাততে পারি না।

এখন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাসায় ফিরে এসেছি। কিন্তু আমার ঘরের টিনের চাল ও বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কীভাবে মেরামত করব ভেবে পাই না।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন