কেন সাংবাদিকতায় পড়ি, ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবনা, পড়ুন শিক্ষার্থীদের মতামত
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, পড়ার বিষয় হিসেবে কেন সাংবাদিকতাকেই বেছে নিয়েছেন তাঁরা। ভবিষ্যৎ নিয়েই বা কী ভাবনা। যোগাযোগ করেছিলেন আমিনা মুমতারিন।
নিজের জায়গা খুঁজে নিতে চাই
নাফিসা আতিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সাংবাদিকতায় ভর্তির সময় বিষয়টি সম্পর্কে খুব একটা স্পষ্ট ধারণা ছিল না, তাই একটু ভয়ও কাজ করছিল। কিন্তু ক্লাস শুরুর পর সেই ভয় অনেকটাই কেটে গেছে। শিক্ষকদের অভিজ্ঞতার কথা শুনে একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এখনো অনেক কিছু শিখছি। মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তথ্য সংগ্রহ, তথ্যের সত্যতা যাচাই, নিজের ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ, সময় ব্যবস্থাপনা ও একই সঙ্গে সংবেদনশীল থাকা—সবই আমার কাছে চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে ঠিক কোথায় নিজেকে দেখতে চাই, এখনো পুরোপুরি জানি না। তবে সাংবাদিকতার নানা ক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে চাই ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজের জায়গাটা খুঁজে নিতে চাই। সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ও নারীদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং সমস্যা তুলে ধরতে চাই।
সাংবাদিকতা শুধু একটি চাকরি নয়
উম্মে তাবাসসুম, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
সত্য প্রকাশের ইচ্ছা থেকেই আমি এই বিভাগে ভর্তি হয়েছি। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, ভুয়া খবরের ছড়াছড়ি ও তথ্যের সত্যতা যাচাই বর্তমানে এই পেশায় বড় চ্যালেঞ্জ। মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ থাকা, নিরাপত্তার ঝুঁকি এসবও মাথায় রাখতে হয়। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো বিবিসি বা আল–জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করা, সততার সঙ্গে সমাজের জন্য ভালো কিছু করা। আমার কাছে সাংবাদিকতা শুধু একটি চাকরি নয়, একটা বড় সামাজিক দায়িত্ব। নানা বাধা সত্ত্বেও স্বাধীন ও সাহসী সাংবাদিকতাই একটি সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি।
বেতন, পদোন্নতি, এসব ভাবাচ্ছে
আবির মুবিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ছোটবেলা থেকেই সংবাদ উপস্থাপনা ও সুন্দরভাবে তথ্য তুলে ধরার বিষয়টি আমাকে আকৃষ্ট করত। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতা পেশার বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। বেতনকাঠামো, পদোন্নতি ও চাকরির অনিশ্চয়তা, মালিকপক্ষের নানা চাপ, সব মিলিয়ে টিকে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সরকারি চাকরি কিংবা অন্য কোনো পেশায় পা বাড়ানোর কথাও বিবেচনা করছি। এখন ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে মানুষ দ্রুত সংবাদ গ্রহণ করছে। ভিউ ও বিজ্ঞাপননির্ভর প্রতিযোগিতায় অনেক সময় আকর্ষণীয় হুক, শিরোনাম, থাম্বনেল তথ্যের গুরুত্বকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ভালো সাংবাদিকতা এখনো হচ্ছে। তবে প্রয়োজন প্রতিযোগিতার মধ্যেও সত্য, প্রাসঙ্গিকতা ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
পেশা হিসেবেও বেছে নেব কি না, নিশ্চিত নই
জয় প্রকাশ মন্ডল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ভর্তির সময়ই পছন্দের বিষয় হিসেবে সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছিলাম। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে তিন বছর। কিন্তু সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেব কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজছি। ক্রীড়া সাংবাদিকতার প্রতি আলাদা টান থাকলেও প্রতিদিনের পড়াশোনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা সাংবাদিকতার নানা চ্যালেঞ্জ সামনে আনছে। নির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর অভাব, চাকরির অনিশ্চয়তা, মালিকানার প্রভাব ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সংকট বেশ ভাবায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার। তবু এখনো আগ্রহ হারাইনি। ভবিষ্যতে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করব। তবে পথটি সাংবাদিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অন্য কোনো পেশায় পা বাড়াব, সেই সিদ্ধান্ত সময়ই বলে দেবে।
নারীর জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বেশি
তাবাসসুম রহমান, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
ছোটবেলা থেকেই সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে পরিচিত, এ ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে। তাই সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হওয়া আমার জন্য হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং দীর্ঘদিনের আগ্রহকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখার ও আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ। এই পেশায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কাজ করার চ্যালেঞ্জ আছে। একজন নারীর জন্য সেটা আরও বেশি। ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়াতে চাই। আমার কাছে সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়; মানুষের না-বলা কথা শোনা, বাস্তবতা তুলে ধরা ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে আনার দায়িত্ব।
গবেষণাভিত্তিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজে আগ্রহ
শরীফা সুলতানা, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ
সমাজ ও রাষ্ট্রকে কাছ থেকে বোঝা এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব রাখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই সাংবাদিকতায় পড়া। আমি বিশ্বাস করি, গণমাধ্যম নিরপেক্ষ না হলে একটি রাষ্ট্র ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে যেতে পারে, ধ্বংস হতে পারে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম ব্যবস্থায় এই সংকট আমাকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পথে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তাঝুঁকি ও নানা পক্ষের চাপের মধ্যেও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ, তবু ভবিষ্যতে গবেষণাভিত্তিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতায় নিজেকে গড়ে তুলতে চাই। দায়িত্বশীল গণমাধ্যম সমাজে জবাবদিহি ও সচেতনতা বাড়ায়। সাংবাদিক শুধু তথ্য দেন না, সঠিক তথ্যের মাধ্যমে মানুষকে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতেও সহায়তা করেন।
বিভিন্ন ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চাই
ইমামুল হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
নিজেকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে চাই, বিভিন্ন ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চাই, এসব ভাবনা থেকেই সাংবাদিকতায় পড়া। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গবেষণা করে সেই তথ্য ও বিশ্লেষণ সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারাটা আমার কাছে খুবই অর্থবহ মনে হয়। আমি মনে করি, সাংবাদিকতা পেশার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং সব সময় স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ না থাকা। তারপরও দায়িত্বশীল ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সমাজে সচেতনতা তৈরি ও মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই পেশার প্রতি আমার আগ্রহ ও সম্মান দুটোই রয়েছে। ভবিষ্যতে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় পেশা গড়ার ইচ্ছে আছে।
দক্ষ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক হতে চাই
মো. মুহাইমিন মুন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস
২০২১ সাল থেকে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ‘স্পোর্টস অ্যারিনা’ নামে একটি ক্রীড়া ও গণমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করছি, যেখানে খেলাধুলার সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া ‘দ্য লিড’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সংবাদ ও তথ্যচিত্র প্রচারের অভিজ্ঞতা আছে। পড়াশোনার পাশাপাশি কনটেন্ট তৈরি ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত আছি। সাংবাদিকতা পেশায় সঠিক তথ্য সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, দ্রুততার সঙ্গে কাজ করা এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে চলাকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করি। ভবিষ্যতে ক্রীড়া সাংবাদিকতা, বিশেষ করে ক্রিকেট ও ফুটবল বিশ্লেষণ নিয়ে লেখালেখির মাধ্যমে একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক হয়ে উঠতে চাই।