বিজ্ঞানের জন্য ভালোবাসা

ক্যাম্পাসের বিজ্ঞানপ্রেমী শিক্ষার্থীরা এক হয়েছেন নোবিপ্রবি সায়েন্স ক্লাবে। ২০২০ সালে সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো সায়েন্স ফেস্টের আয়োজন করা হয়েছিল। অংশ নিয়েছেন প্রায় ৩৫০ শিক্ষার্থী।

ক্লাবের একটি চমকপ্রদ আয়োজনের নাম ‘পিএইচডি গল্প’। প্রতি মাসেই এ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এখানে শিক্ষকেরা তাঁদের পিএইচডি ও গবেষণাসংক্রান্ত বিষয়গুলো ছাত্রছাত্রীদের সামনে গল্পের মতো করে উপস্থাপন করেন।

সায়েন্স ক্লাবের উপদেষ্টা ও ফার্মেসি বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলছিলেন, ‘শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে ৩ জুলাই প্রায় ৪০০ ছেলেমেয়েকে নিয়ে “গবেষণায় হাতেখড়ি” নামে আমরা একটা সায়েন্টিফিক সেমিনার করেছি। গবেষণা কী, কেন এবং কীভাবে করতে হয়—সেমিনারে এসব নিয়ে কথা হয়েছে।’

অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে বসবে ‘নোবিপ্রবি সায়েন্স ফেস্ট’। আয়োজকদের আশা, দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই এতে অংশ নেবেন। শফিকুল ইসলাম বলেন, নোবিপ্রবি সায়েন্স ক্লাবের লক্ষ্যই হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্ক মনোভাব ও গবেষণাধর্মী চিন্তার বিকাশ ঘটানো।

শিক্ষার্থীদের গড়া ক্যাফেটেরিয়া

জেলা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাসে মানসম্মত কোনো ক্যানটিন নেই। বাইরের কোনো অতিথি ক্যাম্পাসে এলে বিব্রত অবস্থাতেই পড়েন শিক্ষার্থীরা। এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী রাহিনুর রহমান একসময় ভাবলেন, নিজেদের উদ্যোগেই তো ক্যাম্পাসে একটা ক্যাফেটেরিয়া চালু করা যায়।

দুই সহপাঠী আবদুল্লা আল-মামুন ও হাসনাত নাঈমকে নিয়ে শুরু হলো কাজ। ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে ‍যুক্ত হলেন মাহবুবুর রহমান ও নজরুল ইসলাম। ক্যাম্পাসের শান্তিনিকেতন নামে খ্যাত সবুজে ঘেরা একটা জায়গা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভাড়া নেন তাঁরা। গড়ে তোলেন ‘ভিস্তা ক্যাফে’।

রাহিন বলছিলেন, ‘ভিস্তা ক্যাফে চালু করার পর ক্যাম্পাসজুড়ে সবার মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। তিন মাস আগে চালু হওয়া আমাদের এই ক্যাফেটেরিয়ায় খরচাপাতি বাদে মাসে এখন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় হয়। পড়ালেখার পাশাপাশি পকেটখরচ জোগাড় করতে এত দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিউশনির পেছনে সময় দেওয়া লাগত। এখন ক্যাফেটেরিয়ায় কর্মচারী আছে। ওরাই দেখভাল করে। আমরা শুধু প্রতিদিন বিকেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় দিই, বাকি সময়টা নিশ্চিন্তে লেখাপড়া করা যায়।’

হোঁচট খেয়েও উদ্যমী ড্যান্স ক্লাব

নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে ড্যান্স ক্লাব। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা ক্লাবটির কার্যক্রম হোঁচট খেয়েছিল করোনা মহামারিতে। ড্যান্স ক্লাবের চর্চা, পরিবেশনা—সবই তো মঞ্চনির্ভর। ক্লাবের সদস্যরা যখন একেকজন একেক জেলায়, নিজ নিজ বাসায় বন্দী, কার্যক্রম চলে কীভাবে? এখন আবার পূর্ণোদ্যমে শুরু হয়েছে ক্লাবের কার্যক্রম। সংগঠনের উপপ্রচার সম্পাদক পূজা ধর বলছিলেন, ‘এরই মধ্যে চল্লিশ ছাড়িয়ে গেছে আমাদের সদস্যসংখ্যা। আমরা নাচের চর্চাকে উৎসাহিত করতে চেষ্টা করি, যেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করার মতো নৃত্যশিল্পী এখানেই গড়ে ওঠে।’

default-image

বিতর্কের চর্চা, অর্জন

বিতর্কচর্চার লক্ষ্য নিয়ে প্রতি সপ্তাহেই বিশেষ অধিবেশন আয়োজন করে নোবিপ্রবি ডিবেটিং সোসাইটি। এ চর্চার ফলও তারা পাচ্ছে। ১ জুলাই এটিএন বাংলা ও ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত ইউসিবি পাবলিক পার্লামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে নোবিপ্রবি ডিবেটিং সোসাইটি।

সংগঠনের সভাপতি ইফতিয়া জাহিন বলেন, ‘আমাদের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৪০০। এর মধ্যে সক্রিয় ১৫০ জনের মতো। প্রতি সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরা নতুন নতুন বিষয় নিয়ে বিতর্কের আয়োজন করি।’

বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা

মধুর সমস্যা বোধ হয় একেই বলে। মাইক্রোসফট, আমাজন ও আইবিএম—বিশ্বখ্যাত তিন প্রতিষ্ঠান থেকেই ডাক পেয়েছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রাক্তন ছাত্র আহমেদ কাওছার। শেষ পর্যন্ত আমাজনকেই বেছে নিয়েছেন কাওছার। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আমাজনের প্রধান কার্যালয়ে অ্যাপ্লায়েড সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করবেন। নোবিপ্রবি থেকে ফলিত গণিতে পড়ালেখা শেষ করে এখন যুক্তরাষ্ট্রের স্টিভেন্স ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে মেশিন লার্নিংয়ের ওপর পিএইচডি করছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেল, কাওছার এর আগে দেশে-বিদেশে বেশ কিছু পদক পেয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর তাঁর ৫২টি গবেষণাপত্র বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নেওয়াজ মোহাম্মদ জানান, কাওছার ছাড়াও বিভিন্ন বিখ্যাত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন নোবিপ্রবির আরও বেশ কজন প্রাক্তনী। যেমন মাইক্রোসফটে কাজ করছেন নোবিপ্রবির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী শামসুল আরেফিন। এ ছাড়া প্রাক্তনীদের মধ্যে ফারজানা সুলতানা যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাপ ডেভেলপার হিসেবে কাজ করছেন। জার্মানিতে সাইট রিলায়েবিলিটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন ইফতেখার আহমেদ।

default-image

শাড়ি-পাঞ্জাবি ডে

কদিন আগে ক্যাম্পাস ঘুরে চোখে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশ দিয়ে হাঁটছেন শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা একদল শিক্ষার্থী। কোনো অনুষ্ঠান আছে নাকি? ১৫তম ব্যাচের হাসিবুল ইসলাম জানান, তাঁরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। সব সময় ক্লাস, ল্যাবের নানা কাজ নিয়ে ব্যস্ততা লেগেই থাকে। প্রাণখুলে আড্ডা দেওয়া আর হয়ে ওঠে না। তাই বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে বিভাগের মেয়েরা শাড়ি আর ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ান। শিক্ষার্থীরা দিনটির নাম দিয়েছেন ‘শাড়ি-পাঞ্জাবি ডে’।

অদ্ভুত যত নাম

ক্যাম্পাসের একেকটা জায়গাকে নিজেদের মতো করে নামকরণ করে নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। যেমন বিবি খাদিজা হলের সামনে দিয়ে একাডেমিক ভবনের দিকে যাওয়া সড়কটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘কাপল রোড’। আছে ‘প্রেমবঞ্চিত রোড’। সবুজে ঘেরা একটি বাগানের নাম ব্যাকলক বন। ক্যাম্পাসের পশ্চিম পাশের বিশাল জলাশয়ের নাম শিক্ষার্থীরা দিয়েছেন ‘ময়নার দ্বীপ’।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী অরিন সিনহা বলছিলেন, ‘ক্যাম্পাস আমার ভীষণ প্রিয়। আমাদের পরিবেশ খুব সুন্দর। সবার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব আছে। শিক্ষকেরাও বেশ আন্তরিক। সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস আমার কাছে খুব আপন মনে হয়।’

যোগ্য গ্র্যাজুয়েট গড়ে তুলছি

default-image

দিদার-উল আলম, উপাচার্য, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

উপাচার্য হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম, এখানে পড়ালেখার পাশাপাশি গবেষণার মান উন্নয়ন করব। আমি নিজেও গবেষণায় যুক্ত। তাই প্রয়োজনগুলো বুঝি। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই ৩৬ জন প্রাক্তন ছাত্র সব রকম বাছাইপ্রক্রিয়া পেরিয়ে শিক্ষক হয়েছে। নিয়োগ পরীক্ষায় নিজেদের ছাত্রছাত্রীদের এত ভালো ফল দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি। আমরা কোনো পক্ষপাতিত্ব করিনি, নিজের যোগ্যতায় ওরা সুযোগ পেয়েছে। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়, নোবিপ্রবি যোগ্য গ্র্যাজুয়েট গড়ে তুলছে।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন