নেপালের দুর্গম পর্বতে পা রাখছেন বাংলাদেশের এই মেয়েরা

নারীদের পর্বতারোহী হিসেবে গড়ে তোলার ধারাবাহিকতায় নিশাতের মাথায় আসে শীতকালীন অভিযানের পরিকল্পনাছবি: নিশাত মজুমদারের সৌজন্যে

হিমালয়ে শীতকালীন অভিযান চালানোটা নানা কারণেই অত্যন্ত দুঃসাধ্য। ৫ হাজার মিটার উচ্চতার পর অক্সিজেনের পরিমাণ সমতল থেকে পুরো অর্ধেক হয়ে যায়। অক্সিজেনের অভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়াই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে পর্যন্ত নেমে যায়। তীব্র শীতের সঙ্গে অভিযাত্রীদের মোকাবিলা করতে হয় তুমুল তুষারঝড়, আচমকা তুষারধস ও ফাঁদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ফাটলের মতো বাধাবিপত্তি। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেই গত দুই বছর ধরে নেপালের দুর্গম পর্বতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের মেয়েরা।

এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী নিশাত মজুমদারের নেতৃত্বে এই অভিযানের নাম ‘সুলতানাস ড্রিম আনবাউন্ড’ বা সুলতানার অবারিত স্বপ্ন। নিশাত মজুমদার বলছিলেন, ‘আমি আর ওয়াসফিয়া নাজরীন এক যুগ আগে এভারেস্ট অভিযান করেছি। এরপর সেভাবে আর কোনো মেয়ে বড় অভিযানে গেল না। আসলে মেয়েদের সামনে বাধা অনেক। এই বাধা কাটাতে তাদের নিয়েই কাজ শুরু করলাম।’

আরও পড়ুন

নারীদের পর্বতারোহী হিসেবে গড়ে তোলার ধারাবাহিকতায় নিশাতের মাথায় আসে শীতকালীন অভিযানের পরিকল্পনা। ২০২৪ সালে তাঁর এই উদ্যোগে সহযোগী হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। দল গঠন ও প্রস্তুতির মধ্যেই আসে আরেকটি সুসংবাদ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউনেসকোর ‘ওয়ার্ল্ড মেমোরি’ তালিকায় স্থান পায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কালজয়ী রচনা সুলতানাস ড্রিম। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ নানা আয়োজনের মাধ্যমে এই স্বীকৃতি উদ্‌যাপন শুরু করে। ‘নারীদের শীতকালীন অভিযান’ সেই উদ্‌যাপনেরই অংশ হয়ে যায়। বিশেষ অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘সুলতানাস ড্রিম আনবাউন্ড’। প্রথম বছরে নিশাত মজুমদারের দলে জায়গা করে নেন অর্পিতা দেবনাথ, ইয়াসমিন লিসা, মৌসুমি আক্তার ও তহুরা সুলতানা। প্রশিক্ষিত পর্বতারোহীদের সঙ্গে উদীয়মানদেরও দেওয়া হয় সুযোগ।

এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী নিশাত মজুমদারের নেতৃত্বে এই অভিযানের নাম ‘সুলতানাস ড্রিম আনবাউন্ড’ বা সুলতানার অবারিত স্বপ্ন।
ছবি: নিশাত মজুমদারের সৌজন্যে

নিশাত মজুমদার বলেন, ‘প্রথমবারই শীতকালে মেয়েদের নিয়ে অভিযান! সিদ্ধান্তটা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম, ঠিকভাবে পর্বতে উঠতে পারব তো! তাই অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার অর্থাৎ ৫ হাজার মিটারের তিনটি পর্বতে অভিযানের পরিকল্পনা করি। এগুলো ছিল নয়া কাঙ্গা পিক, ব্যাডেন পাওয়েল পিক ও ইয়ালা পিক। এর মধ্যে দুটিতে উঠতে আমরা ব্যর্থ হই। সেই ব্যর্থতা আমাদের দমাতে পারেনি, পরিকল্পনা নতুন করে সাজিয়ে অন্য দুটি শৃঙ্গে আরোহণ করি।’

প্রথম অভিযানে উদীয়মান পর্বতারোহী ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী অর্পিতা দেবনাথ। ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা শুনছিলাম তাঁর কাছে, ‘২০২৩ সালে সাধারণ একটি পর্বতাভিযান দলে ভেড়ার চেষ্টা করেও শেষ মুহূর্তে বাদ পড়ি। কষ্টটা মনে গেঁথে ছিল। তাই দ্বিতীয়বার দলে ভেড়ার সুযোগ পেয়ে আর পিছু হটিনি। রোজ পাঁচ কিলোমিটার দৌড়, ব্যাগে ওজন নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে গিয়ে ১৫ তলা ভবনে কয়েক দফা সিঁড়ি ভাঙা, কঠোর ডায়েট করে জীবনযাপনই বদলে ফেলি।’

এভাবে ওজন কমিয়ে, ফিটনেস বাড়িয়ে অবশেষে পেলেন সবুজসংকেত। পর্বতে গিয়ে অর্পিতা নতুন করে উপলব্ধি করলেন একটি সহজ সত্য—ভয়কে জয় না করলে সামনে এগোনো যায় না। তাঁর ভাষায়, ‘নিজেই নিজের সীমানা টেনে রেখেছিলাম। পর্বতে গিয়ে তা অবারিত হলো। বুঝলাম, আমার পৃথিবীটা আকাশের মতো বিশাল।’

আরও পড়ুন

আগের অভিযানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ২০২৫ সালে ৬ হাজার মিটার উচ্চতার একটি শৃঙ্গে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। পাঁচজন যাওয়ার কথা। কিন্তু বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ান একজন। নিশাত মজুমদার বলেন, ‘আমরা যতই বলি মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে, বাস্তবে তাদের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। জীবনের নির্দিষ্ট একটা পর্যায়ে এসে অনেক সিদ্ধান্ত তাদের গতি থামিয়ে দেয়।’

উদীয়মান নুসরাত জাহান ফাবিহাসহ চারজনের দল গত ডিসেম্বরে নেপালের অন্নপূর্ণা হিমালের ছয় হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার দুটি পর্বতে অভিযানে যান। তাঁদের প্রথম লক্ষ্য ছিল পিসাং পর্বত। বেশ কিছু প্রতিকূলতার কারণে মাত্র ২০০ মিটারের একটু বেশি উচ্চতার ব্যবধান থেকে ফিরে আসতে হয়। পরে তাঁরা ৬ হাজার ৫৯ মিটার উচ্চতার চুলু ফার ইস্ট জয়ের জন্য পা বাড়ান। ১৫ ডিসেম্বর সকাল ৭টা ১৯ মিনিটে তাঁরা এই পর্বত চূড়ায় ওঠেন।

বিজয় দিবসের এক দিন আগের এই পর্বত জয় মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন পর্বতারোহীরা। সেই সঙ্গে তাঁরা স্মরণ করেন নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে, যাঁর সৃষ্টি এই পর্বতাভিযানের অন্যতম নেপথ্য অনুপ্রেরণা।

নিশাত মজুমদার বলছিলেন, ‘প্রতিবছরই আমরা নতুন নতুন শিখর জয় করে সুলতানার স্বপ্ন উদ্‌যাপন করতে চাই।’