পানির নিচে বাঘের সঙ্গে লড়াই করে যেভাবে বেঁচে যান মুক্তার হোসেন

সুন্দরবন
প্রথম আলোর ফাইল ছবি

ভোরের সূর্য লাল হয়ে যখন সুন্দরবনের মাঝখান থেকে উঠছে, তখন চুনকুড়ি নদীর হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে জাল টানছিলেন মুক্তার হোসেন গাজী। জালের অন্য মাথায় ছিলেন কালাম ও নিমাই। আর নৌকার ওপর বইঠা হাতে বসে ছিলেন আবদুস সাত্তার।

জাল টানতে টানতেই মুক্তার হোসেন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন একটা বাঘ! চিন্তার কোনো সুযোগ না দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বাঘটা তাঁর ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ল। ঘাড়ের ওপরে সামনের দুই থাবা আর পেছনের দুই পা দিয়ে কোমরটা চেপে ধরল। এভাবে চার পা দিয়ে শিকারকে কোলের কাছে টেনে নেওয়াটা বাঘের ধর্ম। সেই চেষ্টাই করছিল বাঘ। এই অবস্থাতেই বাঘকে পিঠে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন মুক্তার হোসেন।

তারপর পানির নিচে চলতে থাকল বাঘে–মানুষে লড়াই।

সালটা মুক্তার হোসেন গাজীর পরিষ্কার মনে আছে। ১৯৯১। তবে ইংরেজি তারিখটা মনে নেই, মাঘ মাসের ২১ তারিখ ছিল, সেটা অবশ্য মনে আছে। তাঁর বয়স এখন ৫২ বছর। বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সিংহড়তলী গ্রামে। ৩১ মার্চ রাতে চুনকুড়ি নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেই গল্প করছিলেন মুক্তার হোসেন গাজী, মাঝে মাঝে তাতে টুকটাক তথ্য যোগ করছিলেন মাঝি আবদুস সাত্তার।

মুক্তার হোসেন গাজী
ছবি: প্রথম আলো

ছয় মাস পর সুস্থ হন মুক্তার

মাঘ মাসের কনকনে ঠান্ডায় গায়ে জড়ানো ছিল একটা চাদর। নদীর পানি বরফের মতো ঠান্ডা। সেই পানিতেই ডুব দিলেন মুক্তার হোসেন, ‘তখন আমার হুঁশ আছে যে আমারে বাঘে ধোরিছে। আমি পানির নিচ দিয়ে সাঁতরে যাচ্ছি। কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হলো, আমার আরেটটু গভীরে যাওয়া দরকার।’

বাঁচার জন্য তিনি আরেকটু পানির গভীরে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পরে মনে হলো, ঘাড় থেকে থাবা ছুটে গেলেও কোমর এখনো ধরে আছে বাঘ। পেছনের দুই পা দিয়ে কোমর ধরছে, ছাড়ছে; ধরছে, ছাড়ছে। এইভাবে একপর্যায়ে তাঁকে ছেড়ে দেয় বাঘ। পানির নিচে দিয়ে আরও খানিকটা দূরে গিয়ে মাথা তোলেন মুক্তার।

পানির তলে মুখে চাদর জড়িয়ে গিয়েছিল। পানির ওপরে উঠেই শ্বাস নেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মুখ থেকে চাদরটা সরালেন মুক্তার হোসেন। তারপরই মনে পড়ল, সাত্তার নৌকায় ছিল। কালাম আর নিমাই জাল টানছিল। তাঁকে ছেড়ে আবার তাঁদের বাঘে ধরল না তো! তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘আমার কিছু হয়নি। তোরা আগায়ে আস। ওরা তখন চারিদিকে হাঁকাহাঁকি করছিল দুই পাশ থেকে নৌকা নিয়ে লোকজন আগায় আসতেছিল।’

পাশে থাকা আবদুস সাত্তার জানালেন, তিনি বইঠা নিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাঘ মুক্তারকে নিয়ে উঠে এলেই বইঠা দিয়ে বাড়ি দেওয়ার জন্য রেডি। কিন্তু বাঘ মুক্তারকে ছাড়াই পানির ভেতর থেকে উঠে এল। তখন তাঁরা আর কিছু করলেন না। বাঘ উঠে চলে গেল। শিকার হাতছাড়া হয়ে গেলে সাধারণত অন্য কাউকে আর আক্রমণ করে না বাঘ।

জখম মুক্তারকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন সহযোগীরা। এলাকায় সোলাইমান নামের একজন ডাক্তার ছিলেন। শুধু বাঘে ধরা রোগীদের চিকিৎসা করেন। তাঁর কাছে চিকিৎসা নিয়ে ছয় মাস পর সুস্থ হয়ে ওঠেন মুক্তার হোসেন। বাঁ পায়ে বাঘের নখ ঢুকে গিয়েছিল। সেই ক্ষতটা সারতে সবচেয়ে বেশি দেরি হয়েছে। অপারেশন করে ওই জায়গাটা আরও গভীর করে কেটে ফেলে দেওয়ার পর ঘা শুকিয়েছে। তবে পিঠে এখনো বাঘের থাবার ক্ষত রয়েছে।

সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতেন মুক্তার হোসেন
ছবি: প্রথম আলো

বনের বন্ধু মৌ খামার

ছোটবেলা থেকেই বছরের অন্য সময় মাছ ও কাঁকড়া ধরলেও তিন মাস সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতেন মুক্তার হোসেন। মধু সংগ্রহের জন্য তাঁর আলাদা পরিচিতি আছে। বাবার এই মৌয়াল–জীবনকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন তিন ছেলে। তবে বাবাকে বাঘে ধরার পর থেকে তাঁরা আর সুন্দরবনে যান না। এখন মৌবাক্স নিয়ে সারা দেশে মধু আহরণের কাজ করেন। যে দুই মাস সুন্দরবনে ফুল ফোটে, তখন তাঁরা বাড়িতে থাকেন। মৌবাক্স নিয়ে এসে সুন্দরবনঘেঁষা বাড়িতেই রাখেন। তাঁদের খামারের নাম ‘বনের বন্ধু মৌ খামার’।

সুন্দরবনের মধুকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে এবার নেপাল যাচ্ছেন মুক্তার হোসেন। আগামীকাল তাঁর ফ্লাইট। ‘ইন্টারন্যাশনাল বি কিপিং কনফারেন্স ২০২৬’ নামের এই সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছেন ১২ জন। মুক্তার ছাড়াও এই দলে রয়েছেন চারজন গবেষক, দুজন মৌচাষি ও পাঁচজন মধু ব্যবসায়ী। সম্মেলন চলবে ৬ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত।

কাঠমান্ডু থেকে ফিরে আবার সুন্দরবনে যাবেন মুক্তার হোসেন।

আরও পড়ুন