যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তোমাদের জন্য ৫ পরামর্শ

পরিস্থিতি যেমনই হোক, নিজের প্রতি আস্থা রাখা, নিজের প্রতি যত্নশীল থাকা জরুরিমডেল: তৃণা, ছবি: সুমন ইউসুফ

লিখেছেন কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাউফুন নাহার

এইচএসসি পরীক্ষার পর আমরা কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের দরজায় পা রাখি। অনেকে মনে করে, এই বয়সে মস্তিষ্কের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ হয়ে যায়। কিন্তু নিউরোসায়েন্স বলে ভিন্ন কথা। এই সময়ের মানুষ আদতে সেই সব নির্মাণাধীন ভবনের মতো, যার শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে সব ঠিকঠাক, দালান দাঁড়িয়ে গেছে। আদতে কিন্তু এই সময়েই বেশ কিছু সূক্ষ্ম, কর্ণবিদারী কাজ চলে পুরোদমে। যেমন টাইলস বা মার্বেল কাটিং, ড্রিলিং, গ্রাইন্ডিং, ওয়েল্ডিং ইত্যাদি। কৈশোরের শেষ প্রান্তে এসে একজন মানুষের মস্তিষ্কের সমস্যা সমাধানকারী অংশটিতেও একই ভাবে সশব্দে নির্মাণকাজ চলে। ফলে মস্তিষ্কের আবেগপ্রবণ অংশটি থাকে আরও বেশি উদ্দীপিত। আবার ঠিক এই সময়েই সামাজিক চাপগুলোও বেড়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি, ক্যারিয়ার বেছে নেওয়া, পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ, রোমান্টিক সম্পর্ক নিয়ে ভাবনা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, নানা কিছু। অর্থাৎ মস্তিষ্কের ভেতরে নির্মাণকাজ চলছে, আর বাইরেও জীবনের চাহিদাগুলো দ্রুতগতিতে বাড়ছে। তাই এই সময়টায় মানসিক চাপ ও বিভিন্ন ধরনের আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া হওয়া অস্বাভাবিক নয়; বরং পরিণত হওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।

যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তোমাদের বলি, পরিস্থিতি যেমনই হোক, নিজের প্রতি আস্থা রেখো, নিজের প্রতি যত্নশীল থেকো।

আরও পড়ুন

এসো, জেনে নেওয়া যাক কঠিন এই সময়ে কী ধরনের আচরণ ও ছোট ছোট অভ্যাস তোমার পথচলাকে সহজ করতে পারে।

১. স্প্রিন্ট নয়, ম্যারাথন

মনে রেখো, ভর্তি পরীক্ষা একটি ম্যারাথন, স্প্রিন্ট নয়। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি সাধারণত চার-আট মাস বা তারও বেশি সময় ধরে চলে। কয়েক সপ্তাহ খুব বেশি পড়ালেখা করে ক্লান্ত হয়ে গেলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, ব্যায়াম, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—এসব বাদ দিলে পড়াশোনার প্রতি অনীহা চলে আসতে পারে। ম্যারাথন দৌড়বিদ যেমন শক্তি সংরক্ষণ করেন, শিক্ষার্থীদেরও তেমনি শক্তি সঞ্চয় করে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তা ব্যবহার করতে হয়।

২. রুটিনে চলো, অনলাইন বাউন্ডারি তৈরি করো

পড়ালেখার জন্য বাস্তবসম্মত রুটিন তৈরি করো। সারা দিন বা সারা রাত এলোমেলোভাবে না পড়ে মনোযোগ ধরে রাখা যায়, এমনভাবে অধ্যয়ন সেশন পরিকল্পনা করো। নির্দিষ্ট বিরতি রাখো, আগের পড়া নিয়মিত রিভিশন করো। সপ্তাহে একদিন নিজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করো। এমনভাবে রুটিন তৈরি করো যেন প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার সময়টা একই থাকে। স্লিপ হাইজিন বা ঘুমের নিয়ম–কানুন মেনে চললে আমরা দিনের বেলায় সতেজ ও কর্মক্ষম থাকি এবং রাতে আরাম করে ঘুমাতে পারি।

আজকাল ইন্টারনেট আসক্তির কারণে অনেকেই রাতে ঠিকমতো ঘুমায় না এবং দিনের বেলায় ক্লান্ত ও অবসন্ন থাকে। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাই পরিমিতিবোধ বজায় রাখা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শর্ট ভিডিও বা অনলাইন গেম সহজেই মনোযোগ নষ্ট করে। পড়ার সময় ফোন নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, শুধু নির্দিষ্ট সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং সীমিত করা সুস্থ অভ্যাস।

৩. তুলনার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসো

মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে যেমন মিল আছে, তেমনি অমিলও থাকে প্রচুর। আমরা প্রত্যেকে আলাদা। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ বা আগ্রহের জায়গা, শেখার ধরন, কাজের ধরন ব্যক্তিভেদে আলাদা। কে কত ঘণ্টা পড়ছে, কে কতগুলো কোচিং করছে বা মক টেস্টে কত নম্বর পেল, এসব দিয়ে নিজের মূল্যায়ন করা যায় না। অন্যের যাত্রায় নয়; বরং তোমার নিজের ধারাবাহিক অগ্রগতির দিকে নজর দাও। যদি কোনো দিন মনোযোগ কম থাকে, মেজাজ খারাপ থাকে বা উদ্বেগ বেশি অনুভূত হয়, তাহলে ‘আমি পারি না, আমি অন্যদের চেয়ে দুর্বল’ বলে নিজেকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকো। বরং নিজেকে বলো, ‘এই মুহূর্তটা কষ্টের, তবে সাময়িক। এই সময়টা কেটে যাবে। আমি আবার ভালো বোধ করব। সব শিক্ষার্থীর জীবনে এমন মুহূর্ত আসে। আমি ধৈর্য ধরতে পারি।’ এসব ক্ষেত্রে তোমার শরীর ও মস্তিষ্ক কী চাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল করো। অনেক সময় একটা ভালো ঘুম, কিছুটা শারীরিক নড়াচড়া, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার ও কিছুক্ষণ বিশ্রামই মস্তিষ্ককে আবার কাজের জন্য উপযোগী অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন

৪. প্রয়োজনে সহযোগিতা নাও

কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে বা মানসিক চাপ বেশি মনে হলে একা সব সামলানোর পরিবর্তে শিক্ষক, সিনিয়র, পরিবার বা সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়াও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।

৫. সাফল্যের সংজ্ঞা বড় করো

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ই জীবনের একমাত্র সফলতার পথ নয়। অন্যের তৈরি করে দেওয়া তথাকথিত ‘ভালো সাবজেক্ট’, ‘খারাপ সাবজেক্ট’ ধারণা থেকে বের হয়ে এসো। বরং ভাবো, তোমার কী করতে ভালো লাগে, কোন বিষয়ে আগ্রহ, কিসে তুমি আনন্দ ও কৌতূহল বোধ করো, সমাজে কী ধরনের অবদান তুমি রাখতে চাও? এসব মাথায় রেখে ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিযুক্ত।

মনে রেখো, নিজের ও অন্যের প্রতি মমতা, শেখার আগ্রহ, দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা, কাজের প্রতি সততা, মানসিক সুস্থতা একটি সুখী ও অর্থপূর্ণ জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।