১৮ হাজারের বেশি প্রাণীর মুখের ছবি তুলেছেন এই আলোকচিত্রী, মাইলফলক ছবিগুলো দেখে নিন
দুই দশক ধরে প্রাণীদের মুখের ছবি তুলে চলেছেন মার্কিন বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী জোল সার্টোরি। এ বছর ১৮ হাজারতম প্রাণীর প্রতিকৃতির মাইলফলক ছুঁয়েছে তাঁর ফটো আর্ক প্রকল্প। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের গল্প শোনাচ্ছেন সজীব মিয়া
২০০৬ সালে আলাস্কার সর্ব উত্তরের ঢালে প্রকৃতি নিয়ে কাজ করার সময় জোল সার্টোরি হঠাৎ জানতে পারেন, স্ত্রীর স্তন ক্যানসার ধরা পড়েছে। কাজ ফেলে দ্রুত নেব্রাস্কার বাড়িতে ফিরে আসেন। শুরু হয় স্ত্রীর দীর্ঘ চিকিৎসা। ছোট ছোট তিন সন্তানকে নিয়ে ঘরবন্দী হয়ে পড়েন সার্টোরি।
সেই সময়ই তাঁর মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে—আগামী শতাব্দীর শুরুতেই যদি পৃথিবীর অর্ধেক প্রাণী প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে মানুষকে সেটা নিয়ে কীভাবে ভাবানো যায়?
উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁর মনে হলো, প্রাণীদের প্রতিকৃতি তুলে ধরা গেলে মানুষ হয়তো তাদের চোখের দিকে তাকাবে। বুঝতে পারবে, এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীরই বেঁচে থাকার সমান অধিকার আছে। ছোট-বড় সব প্রাণীরই রয়েছে সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা আর স্বাতন্ত্র্য।
এই ভাবনা থেকেই একদিন নেব্রাস্কার লিংকন শিশু চিড়িয়াখানায় ঢুকে পড়লেন। ক্যামেরার সামনে আনেন টাকমাথা, বড় দাঁতওয়ালা একটি নেকেড মোল র্যাটকে। সেটিই ছিল ফটো আর্ক প্রকল্পের প্রথম প্রতিকৃতি।
কালো কিংবা সাদা পটভূমিতে সার্টোরির তোলা একটি ইঁদুর আর একটি হাতি সমান মর্যাদা পায়। তাঁর চোখে কেউ বড় বা ছোট না।
প্রথমে এটি ছিল নিজেকে ব্যস্ত রাখার একটি উপায়। পরে সেটিই হয়ে ওঠে নেশা, পেশা এবং শেষ পর্যন্ত জীবনের লক্ষ্য।
দুই দশকে ১৮ হাজারের বেশি প্রাণী প্রজাতির প্রতিকৃতি তুলেছেন সার্টোরি। অধিকাংশই চিড়িয়াখানা, অভয়ারণ্য কিংবা সংরক্ষণকেন্দ্রে থাকা প্রাণী। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে এখন তাঁর পরিবারের সদস্যরাও যুক্ত। অস্থায়ী স্টুডিও নির্মাণ, আলোর ব্যবস্থা ও ভিডিও ধারণের কাজ করে ছেলে কোল। সময়সূচি ও ভ্রমণ পরিকল্পনা সমন্বয় করেন স্ত্রী ক্যাথি। তাঁদের সঙ্গে কাজ করছেন ডেটাবেজ ব্যবস্থাপক, ট্যাক্সোনমিস্ট এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রাণিবিজ্ঞানী ও চিড়িয়াখানার কর্মীরা।
১৮ হাজারতম ছবি
এ বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ায় তিন সপ্তাহের এক অভিযানে যান সার্টোরি ও তাঁর দল। মধ্য অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমি থেকে তাসমানিয়ার গবেষণাগার—সব মিলিয়ে ৩৬টি প্রতিষ্ঠানে ছবি তোলেন তাঁরা। তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাগারেও কাজ করেছিলেন তাঁরা।
সেখানেই একটি স্বচ্ছ পাত্রে হাঁটছিল তিন ইঞ্চি লম্বা একটি মাছ। সেই মাছটির সামনে দাঁড়িয়ে ক্যামেরার শাটার চাপেন সার্টোরি। এখন ছবিটি শুধু একটি মাছের প্রতিকৃতি নয়, এটি ফটো আর্কের ২০ বছরের যাত্রার ১৮ হাজারতম মাইলফলক।
১৮ হাজারতম প্রতিকৃতি হিসেবে নির্বাচিত মাছটির নাম রেড হ্যান্ডফিশ। অন্য মাছের মতো সাঁতার কাটার বদলে বড় পাখনাকে হাতের মতো ব্যবহার করে সমুদ্রতলে হাঁটে এই বিরল মাছ। আকারে এটি মানুষের বুড়ো আঙুলের চেয়েও ছোট। এত ধীরে চলে যে একটি বাস্কেটবল কোর্টের সমান দূরত্ব অতিক্রম করতেই লেগে যায় প্রায় এক বছর।
বন্য পরিবেশে এখন টিকে আছে ২৫০টির কম রেড হ্যান্ডফিশ। আবাস ধ্বংস, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের কর্মকাণ্ড এই প্রজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতি
সার্টোরির ক্যামেরায় ধরা দেওয়ার অল্প সময় পরই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে অনেক প্রাণী। তেমনই একটি প্রাণী টাফি, পানামার ‘র্যাবস ফ্রিঞ্জ-লিম্বড ট্রি ফ্রগ’ প্রজাতির শেষ জীবিত সদস্য। আটলান্টা বোটানিক্যাল গার্ডেনের একটি সংরক্ষণকেন্দ্রে এটির ছবি তুলেছিলেন সার্টোরি।
টাফির পরিচর্যাকারী মার্ক মানডিকা একদিন তাঁকে বলেছিলেন, প্রতিদিন সকালে কাজে গিয়ে তাঁর মনে হতো, হয়তো আজই শেষবারের মতো টাফিকে জীবিত দেখবেন।
কয়েক মাস পরে এক বর্ষার সকালে টাফির প্রজনন-ডাক মাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য মোবাইল ফোনে ধারণ করা সম্ভব হয়। দুই বছরের কম সময় পরে টাফি মারা যায়। সেই সঙ্গে পৃথিবী হারায় একটি প্রজাতি।
পরে ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার দেয়ালে প্রদর্শিত হয় টাফির প্রতিকৃতি। সার্টোরি এখনো সেই গল্প বলেন। তাঁর ভাষায়, ‘বিলুপ্তি দেখতে ঠিক এমনই।’
এখনো অনেক পথ বাকি
১৮ হাজার প্রতিকৃতিতেই থামতে চান না সার্টোরি। তাঁর লক্ষ্য ১৯ হাজার, ২০ হাজার—তারও বেশি।
তাঁর বিশ্বাস, পৃথিবীর প্রাণিজগতের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংগ্রহ সম্পূর্ণ করতে এখনো অন্তত ২৫ বছর লাগবে।
তাঁর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রাণীদের তালিকায় আছে ইন্দোনেশিয়ার জাভান গন্ডার ও ভিয়েতনামের টঙ্কিন স্নাব-নোজড বানর। এদের ছবি তোলার সুযোগ এলে সব কাজ ফেলে ছুটে যাবেন।
জোল সার্টোরির কাছে একেকটি প্রতিকৃতি একটি দলিল—একটি প্রজাতি যে পৃথিবীতে একসময় ছিল, তার সাক্ষ্য। তবে তিনি চান না, তাঁর ছবিগুলো বিলুপ্ত প্রাণীর স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকুক। বরং এগুলো মানুষকে সময় থাকতে প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার লড়াইয়ে নামতে উদ্বুদ্ধ করুক। কারণ, তাঁর বিশ্বাস, একটি ছবিও কখনো কখনো বদলে দিতে পারে একটি প্রজাতির ভবিষ্যৎ।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও জোল সার্টোরি ডটকম